মদনমোহন সামন্ত, কলকাতা : এত উতলা হয়ে কার জন্য অপেক্ষা সেটা আমাকে মুখে না বললেও আমি ‘থট রিডিং’য়ে জেনে গিয়েছি। দাদারা, ভাইয়েরা আর লুকিয়ে লাভ নেই। বৌদিরা, দিদিরা ও বোনেরাও আর গোপন রাখতে পারবেন না! বুকের পাটা থাকলে একবার পরীক্ষা করে দেখার অনুরোধ রইল।

না, এর জন্য সামনাসামনি হাজির হওয়ার দরকার নেই। আগাম বুকিং ফী-ও নেই। লজ্জা লজ্জা ভাব করারও কোন উপায় নেই, কারণ ধরা দিতে না চাইলেও ধরা পড়েই গিয়েছেন। ভাবছেন কি সব আজগুবি বকছি! মোটেই নয়। একশত ভাগ নির্ভুল। যেন শহরতলীর কোন লোকাল ট্রেনের চোস্ত হকারের ক্যানভাসিং।

হকার মশায়ের দিকে তাকাতে না চাইলেও ক্যানভাসিংয়ের গুণে মাঝেমাঝে আড়চোখে বাধ্য হয়ে দেখে নেওয়ার মত অথবা শুনতে না চেয়ে চোখ বুজে ঘুমের ভান করেও কান খাড়া রেখে শোনার মত যেন শুনে চলেছেন। কথা শেষ হতে না হতে কথাগুলি আরও এগোতে থাকে সামনের দিকে এগিয়ে চলা রেলগাড়িটার মত। তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত, পরকীয়াতে জড়িয়ে দাদারা ও ভাইয়েরা অথবা বৌদিরা, দিদিরা ও বোনেরা যাঁরা এখন খাবি খেয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রাখবেন ভেবেছেন, তাদের হাটে হাঁড়ি ভাঙতে আর কেউ না থাকুক এই অধম মদনমোহন সামন্ত এসে গিয়েছে। এই পর্যন্ত শুনে কপট ঘুমের ভান ছেড়ে ধড়মড়িয়ে সজাগ হয়ে চোখ কচলে আমড়াআমড়া চোখে যখন ভালভাবে দেখার চেষ্টা করছেন তখন বুকের ভিতর থাকা পিন্ডিখানা ধড়াসধড়াস করে এমন জোরে বাজছে যেন পাশে বসা সহযাত্রীও লাফ দিয়ে উঠবে! নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছেন, আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছে নাতো!

তার তো থামার লক্ষণ নেই। আপনার কানে তখন লাউভস্পীকার বাজছে যেন। শুনতে পাচ্ছেন… ভালয় ভালয় মুখ খুললেন না যখন, তখন আমিই ফাঁস করে দিচ্ছি! কুলকুল করে ঘেমে আর কী হবে? পারলে ‘কুল ডাউন’ থাকলে বিপি নর্মাল থাকবে। অনেক হল, এবার বলেই ফেলি ! আর যায় কোথায়! এই বুঝি ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল! মুখ লাল হয় আসছে, কান গরম হয়ে উঠছে। শিরদাঁড়া বেয়ে বরফের থেকেও ঠান্ডা স্রোত নামতে শুরু করেছে। সবার সামনে আজ বেইজ্জতি হয়ে যাওয়ার আগে একবার অন্যদের মুখে সার্চলাইট ফেলার মত তাকিয়ে নিলেন। দেখলেন, সবারই একই অবস্থা। লাফিয়ে ঝাঁপ দেবেন নাকি ছুটে পালাবেন ভাবতে ভাবতে শুনতে পেলেন, দাদারা ও ভাইয়েরা ওয়েট করছেন তাদের প্রাণাধিকা প্রিয়া ‘বৃষ্টি’ আর ‘বর্ষা’র জন্য। আর বৌদিরা, দিদিরা ও বোনেরা অধীর কখন তাদের প্রাণাধিক প্রিয় ‘বর্ষণ’ আর ‘বাদল’ এসে তাদের প্রাণ জুড়িয়ে দেবে। তবে আর কি! কে কার প্রাণ জুড়াবে সেদিকে ধ্যান না থাকলেও একটু বল পেলেন প্রাণে এই ভেবে, যাক, আসল নামটা বলেনি! তাহলে আমি টার্গেট নই! হঠাৎ চারশ’ চল্লিশ ভোল্টেজ ঝটকা! ‘গোপন কথাটি’ আর গোপন রাখা গেল না ! তবে? নাহ্, আর ভাবতে পারা যাচ্ছে না। কার মুখ দেখে যে আজ বেরিয়েছিলেন শতচেষ্টাতেও মনে করা যাচ্ছে না। কানে বাজছে, কিন্তু দাদারা ও ভাইয়েরা, রক্ষাকবচ সঙ্গে রাখলে সিবিআই তো কোন ছার, বাড়ির শ্রীমতী ভয়ঙ্করীও সব জেনেশুনে ঝাঁটা হাতে তেড়ে না এসে গান ধরবেন ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন… ‘ । আর ওদিকে বৌদিদের দাদারা, দিদিদের ও বোনেদের জামাইবাবুরা হাতে হাঁসুয়ার বদলে গোড়ের মালা হাতে ‘বাদল’ আর ‘বর্ষণ’দের অভ্যর্থনা জানিয়ে গেয়ে উঠবেন, ‘এসো শ্যামল সুন্দর, আন তব তাপহরা, তৃষাহরা সঙ্গসুধা…..’। ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল! তাহলে কবচ, থুড়ি, রক্ষাকবচ বিক্রির জন্য এতক্ষণ এত ধানাইপানাই চলছিল! কত দাম পড়বে?জিজ্ঞাসা করার আগে শুনলেন, হাওয়া আপিস বলেছে বিষ্যুদবারের আগে বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। মৌসুমী বায়ু আসতে দেরি করছে। দোষ ‘মৌসুমী’র নয়, আসল নাটের গুরু নাকি ‘বায়ু’, অন্তত হাওয়াবিজ্ঞরা যেমনটি মগজধোলাই করছেন। আরব সাগরের ‘বায়ু’ ঝড় সব জলকণা শুষে আরবপতিদের দিয়ে বাঙালিদের ভিখারি বানিয়ে ছেড়েছে।চাতক পাখির মত অপেক্ষা করতে হচ্ছে কখন জীবনের জন্য দু’ফোঁটা নামবে। বিকল হাওয়া কল থেকে যেটুকু বিভ্রান্তিকর পূর্বাভাস পাওয়া যেত সে সম্ভাবনাও হাওয়া। ব্যস, তবে আর কী! বারিধারায় চিত্তপ্রসন্ন হোক বা না হোক, টেনশনমুক্তির আনন্দে সবাই মিলে গলার পরোয়া না করে গাইতে শুরু করলেন, ‘আল্লা, ম্যাঘ দে, পানি দে….. ।’ লিঙ্গ, বয়স, জাতপাত সব ভুলে কায়মনোবাক্যে এখন যে সব্বার ওই একটাই প্রার্থনা। তাহলে, দুধে আমে মিশে গেল, আঁঠি হল সার! আমি পগার পার। সব যখন জলের মত স্বচ্ছ, কাটমানির প্রশ্নই ওঠেনি, হাওয়াবদলের আগে আমি নিজেই হই হাওয়া… হাওয়াই…..!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here