প্রসূন আচার্য সাংবাদিক :জুনিয়র ডাক্তার-সহ চিকিৎসকদের ঐক্যেবদ্ধ আন্দোলনের ফল আমরা আজ লাইভ- এ দেখলাম।

দু’দিন আগের চড়া চিৎকৃত শাসক মুখ্যমন্ত্রী আজ নমনীয় অভিভাবক। মেনে নিলেন অধিকাংশ দাবি। পুলিশ স্বীকার করল তাঁদের অপদার্থতা।

ক’দিন আগে আইনজীবীরাও তাঁদের টানা আন্দোলন দেখিয়েছেন। শাসক নিচু হয়েছে। দুটি ঘটনারই সূত্রপাত কর্মরত অবস্থায় অন্যদের হাতে অন্যায় ভাবে মার খাওয়াকে কেন্দ্র করে। আমরা, শুধু সাংবাদিকরাই এমন আন্দোলন করতে পারি না। শুধুই মারই খাই বছরের পর বছর। খুনও হই। আমাদের না আছে চাকরির নিরাপত্তা, না আছে টাকা-পয়সা। মুখেই ফুটুনি। কাগজের Byline বা টিভিতে মুখ দেখাতে পারলেই নিজেদের বিরাট মনে করি। পড়শীর কাছে বুক উঁচু করে চলি।

ভোট চলাকালীন এত জন (প্রায় 25 জন) সাংবাদিক, ক্যামেরা পার্সন, চিত্র সাংবাদিক যে মার খেলেন, কারও মাথা ফাটল, রক্তাত্ব হল, গাড়ি ভাঙচুর হলো, একজনও গ্রেফতার হয়েছে ? একজনেরও শাস্তি হয়েছে ? মনে হয় না। বিভিন্ন সময়ে, এই যেমন দুই বছর আগে রাজীব কুমার কলকাতার পুলিশ কমিশনার থাকার সময় সাংবাদিকদের পুলিশ মারল, পিটিয়ে ক্যামেরা ভেঙে দিল, কিছু হয়েছে ? না। হয়নি। এই যে তিন দিন আগে কোচবিহারে সাংবাদিকরা মার খেলো, তাঁদের মোবাইল ফোন ভেঙে দেওয়া হল, কিছু হয়েছে? হয়নি।

এর দুটো কারণ। এক, আমরা নেহাতই বেতনভুক্ত কর্মচারী। এই বাজারে চাইলেই একজনের বদলে দু’জন সাংবাদিকের চাকরি করতে রাজি হয়ে যাবে। বরং আরো কম টাকায়। দুই, মালিক কর্তৃপক্ষ নানা কারণে সরকার বা শাসক দলের সঙ্গে কোনো সংঘাতে যেতে চায় না। তারমধ্যে বিজ্ঞাপনের আয় অন্যতম। আমারাও বার বার প্রহৃত হয়ে তা মেনে নিতে বাধ্য হই। কারণ মাসের শেষে টাকাটা দরকার। যদিও পটনা, গুয়াহাটি এমনকি শিবসাগরের মতো ছোট শহরেও আমি সাংবাদিকদের ভূমিকা বাংলার তুলনায় অনেক সক্রিয় হতে দেখেছি। প্রশাসক তাঁদের কাছে নানা সময় নত হয়েছেন।

আর দেখেছি, কলকাতায় কিছু দালাল গোছের সিনিয়র সাংবাদিক প্রতিবাদীদের কানের কাছে গুন গুন করে বলতে থাকে, আমাদের মার খাওয়াটা একটা ‘প্রফেসনাল হ্যাজার্ড’। যে দালাল গুলো এ কথা বলে 31 বছরে তাঁদের কোনোদিন মার খেতে দেখিনি। সিপিএম আমলে যখন নন্দীগ্রাম বা সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় মূলত জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের মার খাওয়ার বিরুদ্ধে মিছিলে যোগ দিয়েছি, তখনও এঁদের রাস্তায় নামতে দেখিনি। আবার তৃণমূল আমলে যখন মিছিল হয়েছে বা জমায়েত, তখনও দেখিনি। এই গিরগিটিরাই মূলত সম্মিলিত প্রতিবাদে আপত্তি তোলে। এঁদের বিরুদ্ধে ধিক্কার।

আর একটা কথা। আজ মুখ্যমন্ত্রী দুটি প্রধান বাংলা চ্যানেল ছাড়া অন্যদের live করার সুযোগ না দিয়ে অনেক কিছু বুঝিয়ে দিলেন। আশা করি বন্ধুরা তা তলিয়ে ভাববেন। ব্যক্তিগত ভাবে বিষয়টি আমার কাছে খুবই অপমানজনক ও খারাপ লেগেছে। এত দীর্ঘদিন সাংবাদিক কর্মী থাকার কারণেই। সরকারি ভাবে live করে অন্যদের ফিড দেওয়া যেতে পারতো। তাতে বড় জোর কিছু দেরি হতো।

আর একটা কথা। কম তো দেখলাম না। প্রবল শক্তিমান জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বলে যে সাংবাদিককে এক সময় দেখেছি রাইটার্স -এ জামার কলার উঁচিয়ে ঘুরতে, পরবর্তী কালে তাঁকেই দেখেছি অন্য জুনিয়র সাংবাদিকের অনুকম্পার পাত্র হতে। রাজনীতিকরা সাংবাদিকদের কাজে লাগায় মাত্র। তারপর ভুলে যায়। 90 দশকে মমতার উত্থানের পেছনেও যে দু’একজন তাঁদেরও একই অবস্থা। এ কথা বললাম এই কারণে, আমার যে সাংবাদিক ভাইটিকে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী সর্বত্র সঙ্গে নিয়ে ঘুরতেন দেশে এবং বিদেশে, আজ দেখলাম, তিনি চ্যানেল হেড হওয়া সত্বেও তাঁর চ্যানেলকে নবান্ন থেকে live করতে দেওয়া হল না। কেন ? TRP কম বলে? তাঁরও কোম্পানির সর্বভারতীয় চ্যানেল আছে। খারাপ লাগলো। একটু বোধহয় দূরত্ব থাকলে ভালো হয়।

কিছু অপ্রিয় সত্য বললাম। সাংবাদিক বন্ধুরা, মনে কিছু করবেন না।

প্রসূন আচার্য। সাংবাদিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here