শ্যামলেন্দু মিত্র # মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তার জন্য বরাদ্দ সরকারি বেতন নেন না।

তিনি যেদিন থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসেছেন, সেদিন থেকেই তিনি তার প্রাপ্য বেতন না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিধায়কদের বেতন বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেন। তাতে বলা হয় মন্ত্রীদের বেতন বেড়ে হলো  মাসে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা। আর বিধায়কদের মাসিক বেতন হলো ৮১ হাজার ৮৭০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে ভাতা।

# বিধানসভায় এই ঘোষণার পরে পরেই ইটিভি-ভারত ডিজিটাল টিভির খবরে বলা হয়, লাখের গণ্ডি ছাড়াল মুখ্যমন্ত্রীর বেতন,পিছিয়ে নেই মন্ত্রী ও বিধায়করাও।

এই খবরটা আমি শেয়ার করার পর তা নিয়ে বিতর্ক বাধে।

# আমার এক ঘনিষ্ঠ ও মুখ্যমন্ত্রী ঘনিষ্ঠ দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক এবং কলকাতা প্রেস ক্লাবের অন্যতম কর্মকর্তা আমাকে হোয়াটস আপে লিখলেন, আমি যতদূর জানি, মুখ্যমন্ত্রী ৮ বছর ধরে বেতন নেন  না। # অথচ,ইটিভি-ভারতের হেডিং-এ লেখা হয়েছে,লাখের গণ্ডি ছাড়াল মুখ্যমন্ত্রীর বেতন!

# এটাও যেমন ঠিক,তেমন এটাও সত্য যে মন্ত্রীদের বেতন বাড়া মানে মুখ্যমন্ত্রীরও বেতন বাড়া।

# মমতা ব্যানার্জি বেতন নেন না যেমন সত্য,তেমনি তার মুখ্যমন্ত্রী পদের বেতন বেড়েছে এটাও সত্য।

# ইটিভি-ভারতের কাছে এই খবরটা হয়তো ছিল না যে মুখ্যমন্ত্রী বেতন নেন না, অথবা খবরটাকে মুচমুচে করার জন্য ‘ মুখ্যমন্ত্রীর বেতন লাখের গণ্ডি ছাড়াল ‘লেখা হয়েছে।

# এই খবরে লেখা উচিত ছিল যে মুখ্যমন্ত্রীরও  বেতন বেড়েছে,কিন্তু তিনি বেতন নেন না।

# অতীতে অন্য মুখ্যমন্ত্রীরা বেতন নেননি,এরকম তথ্য আমার জানা নেই।

# বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য  অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেতন নিতেন। দেখেছি,মহাকরণে তার ঘরে অর্থ দফতরের এক অফিসার এসে বেতনের খাম দিয়ে বড় একটি খাতায় মুখ্যমন্ত্রীর সই করিয়ে নিয়ে যেতেন। মুখ্যমন্ত্রী গুনেও দেখতেন না। তিনি খামটি তার আপ্ত সহায়ক জয়দীপ মুখার্জিকে দিয়ে দিতেন। তিনি আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে দলীয় অফিসে নির্দিষ্ট কাউকে খামটি দিতেন। এটাই মুখ্যমন্ত্রী থেকে মন্ত্রীদের বেতনের খাম পার্টিকে ফেরত দেওয়া ছিল দস্তুর। এবার পার্টি মুখ্যমন্ত্রী সহ মন্ত্রীদের সংসার চালানোর খরচ দিতেন। তা দেওয়া হতো এক একজনকে এক এক রকম। বুদ্ধবাবুর স্ত্রী চাকরি করতেন বলে তিনি যা পেতেন,অন্য এক মন্ত্রীর স্ত্রীর যদি বেকার গৃহবধূ হলে তিনি বেশি পেতেন।

# আমি সবটা জানি না, তবে আমার মনে হয় তৃণমূলেও  মন্ত্রী-বিধায়কদের তাদের বেতনের একটা অংশ দলকে লেভি হিসেবে দিতে হয়।

# অনেকদিন আগের কথা। বামফ্রন্ট আমল। আজকালের সাংবাদিক হিমাংশু হালদার আরামবাগের মায়াপুর যাচ্ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের বাড়ি,তার সঙ্গে দেখা করতে।

ট্রেনে তারকেশ্বর নেমে একটি বাসে চেপেছেন মায়াপুর যাবেন বলে। এমন সময় তারকেশ্বর বাস স্ট্যান্ডে একজন বয়স্ক লোককে ভিক্ষে করতে দেখে বাসের লোকজন বলাবলি করছেন, ইনি হলেন প্রাক্তন এমএলএ মহাদেব মুখার্জি। সাংবাদিক হিমাংশু হালদারের কাছে সব সময় ক্যামেরা থাকে। তিনি বাস থেকে নেমে পড়লেন। কথা বললেন সেই ভিখারির সঙ্গে। তারপর প্রাক্তন বিধায়ক তথা ভিখারির  সঙ্গে  তার বাড়ি হরাদিত্য গ্রামে যান। ভগ্নদশা বাড়ি,সঙ্গীন অবস্থার চিত্র ক্যামেরা বন্দী করে তারপর অন্য বাসে গেলেন মায়াপুরে প্রফুল্ল সেনের কাছে।

ফিরে এসে ওই সাংবাদিক আজকাল পত্রিকায় প্রাক্তন বিধায়কের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরলেন। তা নিয়ে বিধানসভায় হইচই হয়।

# এই খবর প্রকাশের ২৮ দিনের মাথায় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বিধায়কদের পেনশন ঘোষণা করলেন।

প্রাক্তন বিধায়করা সেই থেকেই পেনশন পাচ্ছেন।

এবারে মন্ত্রী-বিধায়কদের বেতন বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে সিমিএম বিধায়ক তথা বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, অনেক প্রবীণ ও প্রাক্তন বিধায়ক দুর্দশার মধ্যে আছেন। প্রাক্তন বিধায়কদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানো বেশি জরুরি ছিল।

# বিধায়কদের পেনশন চালুর পরে এক সরকারি অফিসার একটি ফর্ম নিয়ে দেখা করতে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের সঙ্গে মিডলটন স্ট্রিটে। অশোককৃষ্ণ দত্তের ফ্ল্যাটে তিনি থাকতেন। আমি একবার তার ইন্টারভিউ নিতে সেখানে গিয়েছিলাম। তখন আমি বর্তমানে।

প্রফুল্ল সেনের কাছে গিয়ে ওই সরকারি অফিসার পকেট থেকে একটি ফর্ম যেই না বের করেছেন অমনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বলাই রাখো তোমার ফর্ম। আমার তো ব্যাঙ্ক একাউন্ট নেই। আমি পেনশন নিয়ে কী করবো?  ওই অফিসার তার পূর্ব পরিচিত এবং তিনি যে পেনশনের ফর্ম সই করাতে এসেছেন এটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন।

# প্রফুল্ল সেন ওই অফিসারকে বললেন, আমরা রাজনীতি করতে এসেছিলাম দেশের জন্য। পেনশন নেওয়ার জন্য নয়। আমি ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্য থেকে এমএলএ,এমপি, খাদ্যমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী হয়েছি। আর কী চাই?  অনেক পেয়েছি। তবে, তার জন্য পেনশন নিতে হবে?

ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন আজকালের সম্পাদক মদন মিত্র ও সাংবাদিক হিমাংশু হালদার। প্রফুল্ল সেনের একটি সাক্ষাতকার প্রকাশিত হয়েছিল আজকালে। সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন হিমাংশুদা। সেই সাক্ষাতকারের চেক দিতে তারা যান। সেই চেক দিতে গেলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমার তো ব্যাঙ্ক একাউন্ট নেই,চেক নিয়ে কী করবো। সম্ভবত  পরে তাকে নগদে দেওয়া হয়।

# বাম আমলে রাজ্যের সেচমন্ত্রী ছিলেন অমলকৃষ্ণ রায়।  তিনি অকৃতদার ছিলেন। তার ঘরে  বসে আছি,এমন সময় তার প্রাইভেট সেক্রেটার সমীর চট্টরাজ এলেন একটা ফর্ম নিয়ে। বললেন, স্যার আপনার নমিনি কে?  সরকার জানতে চেয়েছে। মন্ত্রী চটজলিদি উত্তর,গর্ভনমেন্ট অব ইন্ডিয়া। তার মানে তার অবর্তমানে তার মন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্য টাকা চলে যাবে ভারত সরকারের কাছে। অদ্ভুত মানুষ।

# ভারতের মধ্যে গরিব মুখ্যমন্ত্রীর তালিকায় এক নম্বরে ছিলেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার।

# বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবন যাপন অতি সাধারণ। সরকারি দুকামরার ফ্ল্যাটে থাকেন।

# বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী  মমতা ব্যানার্জি তার প্রাপ্য বেতন নেন না।

থাকেন টালির এক কামরা ঘরে। সাধারণ জীবনযাপন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here