আমার কথা # নকশি কাঁথা-১ # দেবদূত ঘোষঠাকুর

0
37

আমার কথা

নকশি কাঁথা-১
দেবদূত ঘোষঠাকুর

কে আমি?

ওপার বাঙলার টাঙ্গাইল (তখন ছিল ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা, এখন নিজেই জেলা) থেকে এপারে সব ছেড়েছুড়ে এপারে চলে আসা উদ্বাস্তু পরিবারে জন্ম।

শৈশব কেটেছে যাবপুরের অরবিন্দ নগরের উদ্বাস্তু কলোনিতে যৌথ পরিবারে।

বেড়ার ঘর, টালি ও টিনের চাল, হ্যারিকেনের আলো, একটা ডিমকে সুতো দিয়ে চারভাগ করে সব ভাইবোনে মিলে খাওয়া- এই সব স্মৃতি বুকে নিয়েই বেড়ে ওঠা। সে এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। যা নিজেকে গড়েপিটে নিতে সাহায্য করেছে।

পৌষ ফাগুনের মেলা
চৈত্র- বৈশাখে আমভর্তি গাছের ডাল হাওয়ায় টিনের চালে লূটোপুটি খেত। সে এক রকম শব্দ। আবার কালবৈশাখীর ঝড়ে আম টিন ও টালির চালের উপর দিয়ে গড়িয়ে আসত এক অদ্ভূত শব্দে। তবে সব কিছুকে হার মানাত টিনের চালের উপরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ। শব্দ শুনেই বলে দেওয়া যেত বৃষ্টির তীব্রতা কতটা।

কখনও সখনও শিল পডত ধুপধাপ করে। উঠোনে নেমে দুই হাত ভরে তুলে নিতাম বরফকণা। একটু চাপ দিলেই বরফের বল হয়ে যেত। সেই বল ছুঁড়ে মারতাম এ ওর গায়ে। বরফ গলে জল। আমার বাবার রাগ যেমন গলে জল হয়ে যেত নিমেষে।
কঠিন গ্রীষ্মের পরে মাটিতে যখন প্রথম বৃষ্টির ফোটা পড়ত , তাপ ফুটে বেরোতো ভূগর্ভ থেকে। মাটিতে কান পাতলে একটা মৃদু শব্দ শোনা যেত। ফূটিফাটা মাটির জল শুষে নেওয়ার শব্দ।

অনেকটা আমাদের শ্বাস ছাড়ার মতো। বর্ষায় পুকুরের জল উঠে আসত রাস্তায়। জল ভেঙ্গে হাটলে সপ সপ আওয়াজ হত। বৃষ্টির সঙ্গে ঝড় বইত সো সো শব্দে। আর মেঘের ডাক শুনেই বুঝতে পারতাম কোনটা শুধুই গর্জাবে, আর কোনটা বর্ষাবে।
পুজোর পর টিনের চালে টুপটাপ করে শিশির পড়ার শব্দে বুঝতাম শীত আসতে আর দেরী নেই।

শীতে খসে পড়ত গাছের শুকনো পাতা। সেই শুকনো পাতার উপর দিয়ে কেউ হেটে গেলে আওয়াজ হত মস্ মস্ মস্। নতুন চামরার জুতো পায়ে কেউ যেন ঘরের ভিতরে হাটা প্র্যাকটিস করছে। শীতের মাঝামাঝি ডাকতে শুরু করত কোকিল। বোঝা যেত ঋতুরাজ দুয়ারে।

শুধু কি শব্দ! বাতাসের গন্ধ শুকেই বলে দিতাম কখন আশ্বিন, কখন হাজির হয়েছে হেমন্ত। বসন্তে গাছে গাছে আমের বোল আসত। সেই আমের বোলের এক রকম গন্ধ। আবার বাতাবি লেবুর গাছের ফুলের মিস্টি মন মাতাল করা গন্ধ।

কাঠাল গাছের পাশ দিয়ে গেলে একটা চেনা গন্ধ বুঝিয়ে দিত গাছে ফুল এসেছে। কালবৈশাখীর সঙ্গে নামা বৃষ্টির জল মাটিতে পড়তেই বের হত সোদা গন্ধ।

ঘোর বর্ষায় ফুটত বেল, চাপা, জুই, গন্ধরাজ। তাদের গন্ধে ম ম করত চারিদিক। কার গন্ধ কতটা তীব্র তা নিয়ে লড়াইয়ে নামত মাধবী লতা আর মালতী লতা। শরৎ কালে শিউলির গন্ধ মনে করিয়ে দিত পুজো এল! নবান্নের নতুন চালের ভাতের গন্ধ বাড়িয়ে দিত খিদে। সে একটা সময় ছিল বটে!

কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ানোর স্বাধীনতায় এক সময় লাগাম পরানো হল। আমি ভর্তি হলাম নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে। বাড়ি ছেড়ে হস্টেলে। শুরু এক নতুন জীবন। নিজেকে তৈরি করার লড়াই।

 

উকিলবাবু।
আমার ঠাকুরদা পূর্ণেন্দু মোহন ঘোষঠাকুর টাঙ্গাইল আদালতের আইনজীবী ছিলেন। টাঙ্গাইল আদালতের বার লাইব্রেরির দেওয়ালে অতীতের বার মেম্বাদের যে তালিকাটা ২০০৪ সালে দেখে এসেছিলাম, সেখানে পূর্ণেন্দু মোহন ঘোষঠাকুরের নামটা ছিল। ওদেশ ছেড়ে পঞ্চাশ দশকের একেবারে গোড়ায় প্রায় এক কাপড়ে এ দেশে চলে আসার পরে আমার ঠাকুরদা আর ওকালতির ব্যবসায় ফিরে যাননি। মন প্রাণ সপে দিয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণের চরণে।

রবিবার রবিবার জেলে গিয়ে বন্দিদের গীতা পড়ে শোনাতেন। ব্যাখ্যা সহ। তা ছাড়া ভাগবত পাঠ শুনতে লোকে এদিক ওদিক ডেকে নিয়ে যেত।

আইনের বই ফেলে ঠাকুরদা ডুবে থাকলেন ইতিহাস, শাস্ত্র আর নানা পুথির মধ্যে। শুরু হল ‘শ্রীনাম ভগবতম’ নামে শ্রীকৃষ্ণের জীবন চরিত লেখার কাজ।

আর সমবয়স্ক বেশ কয়েকজন বন্ধুও জুটে গেল। কেউ ডাক্তার, কেউ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, কেউ বা সরকারি কর্মী। আইনজীবী পূর্ণেন্দুবাবুর মধ্যে যে কবি সত্ত্বা লুকিয়ে রয়েছে তা প্রমাণ করে দিল ‘শ্রী নাম ভাগবতম’।

তিন বছর বয়স থেকে রাতে ঠাকুরদার সঙ্গে ঘুমোতাম। অনেক দিন সকালে ঘুম ভাঙত ঠাকুরদার উদাত্ত কন্ঠের গানে। নিজেই লিখে সুর দিয়েছিলেন। স্ত্রী, এগার ছেলেমেয়ে আর নাতি নাতনিদের (তখনও পর্যন্ত যারা জন্মেছিল) উদ্দেশে লেখা ওই গান এখনও কানে বাজে-

শ্রীকৃষ্ণে জাগো আমার মন—
জাগো দেবী সুরপ্রভা,
প্রেমে পুণ্যে মনোলোভা
শ্রীনাম ভাগবতে দিয়ে তনু মন,
শ্রীকৃষ্ণে———

জাগো শ্রী মিলনানন্দ
দূরে থাক সব মন্দ
নামে লভ সুপবিত্র সুন্দর জীবন,
শ্রীকৃষ্ণে———

মৈয়েত্রী, গায়ত্রী, মা গো,
শিবানী, জয়শ্রী জাগো,
বাসুদেব,হৃষিকেশ, রঘু, নারায়ণ,
শ্রীকৃষ্ণে———

জাগো ত্যাগী শ্রীশঙ্কর,
সংসারেতে ছত্রধর
বিশ্বরূপ কৃষ্ণ-কথা কর বিতরণ
শ্রীকৃষ্ণে———

************************
অজিৎ, বিজয় জাগো
সমাজ সেবায় লাগো,
সার্থক করিয়া লও মানব জনম,
শ্রীকৃষ্ণে———

অনিমা, অসীমা মাগো
স্বস্তী, লক্ষ্মী, কৃষ্ণা জাগো,
গৃহস্থ আশ্রমে কর অমৃত সিঞ্চন,
শ্রীকৃষ্ণে———

**************************

প্রবীর প্রণব পার্থ,
অনাদি, অনিতা তীর্থ,
আবীরা, সমীরা, শুভ্রা জাগোরে চন্দন,
শ্রীকৃষ্ণে———

জয়ন্তী, অজন্তা, জনা,
সুভদ্রা, সুমিত্রা, মনা,
স্বধা, নন্দা লভ নামে নব জগরন,
শ্রীকৃষ্ণে———

গোপাল, গোবিন্দ, রমা,
মাধব, মুকুন্দ, উমা,
শিবাজী, রামজী জাগো ভক্তিপূর্ণ মন,
শ্রীকৃষ্ণে———

জাগো ভাই শিবাশিস,
নামে পূর্ণ কর দিশ,
শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণ কর পূর্ণেন্দু-জীবন
আনন্দে জাগো আমার মন।।

( মিলন, শঙ্কর, নারায়ণ, হৃষিকেশ, বাসুদেব, বিশ্বরূপ, রঘুদেব -সাত ছেলে। দ্বিতীয় জন আমার বাবা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা গোটা পরিবারের হাল ধরেছিলেন। মৈত্রেয়ী, গায়ত্রী, শিবানী আর জয়শ্রী-চার মেয়ে। স্বস্তি আমার মা। গোপাল, গোবিন্দ, রমা- আমরা তিন ভাইবোন )।

ঠাকুরদাকে কখনও রাগ করতে দেখিনি। জীবনের উপর দিয়ে যে এত ঝড়ঝাপটা গিয়েছে বোঝা যেত না। সংসারে থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের তিন ভাইবোনের উপরে অসম্ভব একটা। টান ছিল ওর। যখন আমরা থাকতাম না তখন প্রকাশ পেত। অরবিন্দ নগরের যে বাড়িটায় আমরা থাকতাম ঠাকুরদা তার নাম রেখেছিলেন তপোবন। একরকম ঠাকুরদার চাপাচাপিতেই ১৯৬৭ সালে গাঙ্গুলি বাগানে জমি কিনে বাড়ি তৈরি শুরু করেছিলেন বাবা। ১৯৬৮ সালের (তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি) নভেম্বরে আমাদের সেই বাড়ির গৃহপ্রবেশ হল। ঠাকুরদা নিজে সব দেখভাল করলেন। পরদিন সকালে ফিরে গেলেন তপোবনে। আমরা তিন রাত থাকলাম ওই বাড়িতে।
ঠাকুরদা বুঝে গিয়েছিলেন আমরা তপোবন ছেড়ে আর কয়েক মাসের মধ্যেই পাকাপাকি ভাবে নতুন বাড়িতে চলে যাব। মানসিক ভাবে সেটা মেনে নিতে পারছিলেন না। গৃহ প্রবেশের তিন দিন পরে আমরা ফিরলাম তপোবনে। পাশের বাড়ির জেঠিমা মা কে ডেকে বললেন, আমার ঠাকূরদা) এ ক’দিন সকালে পায়চারি করেছেন আর গেয়েছেন- গোপাল গোবিন্দ (আমাদের দুই ভাইয়ের ডাক নাম) বিনা তপোবন অন্ধকার। চোখ দিয়ে গড়িয়েছে জল।
সেই দিনটা অবশ্য আর দেখতে হয়নি ঠাকুরদাকে। বছর শেষ হতে না হতেই আমাদের পাকাপাকিভাবে ছেড়ে চলে গেলেন ঠাকুরদা নিজেই। এত দিন পরে মনে হচ্ছে ঠাকুরদার মৃত্যুটা হয়তো ইচ্ছা মৃত্যু। আমাদের গৃহপ্রবেশ হয় ৭ ই কার্তিক। একটা অসম্পূর্ণ বাড়িতে ঠাকুরদার প্রবল ইচ্ছা হারিয়ে দেয় ঠাকুমার প্রবল অনিচ্ছাকে।ঠাকুমা কিছুতেই কার্তিক মাসে গৃহপ্রবেশ করাতে চাননি। আমরা তপোবনে ফিরে আসার পরে আর মাত্র দশ দিন ছিলেন।ওপারের ডাক অনুভব করেছিলেন।
হেমন্তের যে ভোরে ঘটনাটা ঘটল আর আগের রাতে সেদিন আমার ভাইয়ের জন্মদিনে ঠাকুরদাকে বোয়াল মাছের দো-পেঁয়াজা রেঁধে খাইয়েছিলেন আমার মা। ওই খাবারটি আমার ঠাকুরদার অতি প্রিয় ছিল। রাতে আমাকে নিয়েই শুয়ে ছিলেন ঠাকুরদা। সকালে উঠে দেখেছি আমি অন্য ঘরে।
ওই ভোরে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমাদের বাড়ি ভর্তি লোক। ধূপ কাঠি,অগরুর গন্ধ চারিদিকে। আমি ঠাকুরদাকে খুঁজছি। রজনীগন্ধার গন্ধ ভেসে আসছে কোথা থেকে যেন। আমি ঠাকুরদার ঘরটা চিনতে পারছিনা কিছুতেই। ঠাকরদা বলে চেঁচাতে যাচ্ছিলাম। দিদির ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। দিদি বলল ঠাকুরদা মারা গেছে। গিয়ে দেখি, যে বিছানায় আমরা দু’জন ঘুমোতাম, সেখানে টানটান শুয়ে আছেন তিনি। গলায় রজনীগন্ধার মালা। ধূপকাঠি জ্বলছে। অগরুর শিশি হাতে আমার এক কাকা ছোটাছুটি করছে। সেই ঘরে, বাইরের উঠোনে, পাশের মাঠে শুধু লোক আর লোক।
ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। আমি এ সব বিশ্বাস করি না। তাই আমার ওই স্বপ্নটার কথা কাউকেই বলিনি। আর বললেও কেউ বিশ্বাসই করত না যে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here