দেবদূত ঘোষঠাকুর # মনের মানুষ-৩১

0
20

দেবদূত ঘোষঠাকুর

মনের মানুষ-৩১

গল্পকার বা সাহিত্যিক হওয়ার বিন্দুমাত্র বাসনা আমার কখনও ছিল না। এখনও নেই। নিজে বরাবর থাকতে চেয়েছি একজন কাটখোট্টা রিপোর্টার হিসেবে। খবরটি পাঠকের পাতে তুলে দেওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে আবেগের মাত্রা চড়িয়েছি। পরে কাগজে দেখেছি আবেগের অংশটা এডিট হয়ে গিয়েছে। আমার প্রথম চিফ রিপোর্টার বিধান সিংহ একদিন কাছে ডাকলেন। কেটে কেটে বললেন,’এটা কি সাহিত্য হচ্ছে!খবর আর সাহিত্য এক নয় কিন্তু। আবেগ হল শরীরে চর্বির মতো। বাদ দিতে হয়। লেখা হবে মেদহীন।’ তারপর একটু গলা চড়িয়ে বললেন, ‘তুই তো কিছুই শিখছিস না। রোজ আবেগের অংশগুলি কেটে বাদ যাচ্ছে। কেন এ ভাবে তোর লেখার একটা অংশ কেটে বাদ যাচ্ছে তা নিয়ে কখনও কিছু জানতে চাসনি।’

কিন্তু এখন স্মৃতির পাতা ধরে ধরে টান দিতে গিয়ে রিপোর্টার সুলভ লেখা পুরোপুরি বেরোচ্ছে না। বিশেষ করে আমার তিন দশকের বেশি সময় রিপোর্টিং করার সুবাদে এমন কিছু মানুষের খোঁজ পেয়েছি যাঁরা ‘সোর্স’ থেকে পরম আত্মীয় হয়ে উঠেছেন। তাঁদের কথাই আমার এই ‘নকশি কাঁথা’-র অন্যতম মূল নকশা। সুতোর ফোঁড় নয়, কিছু বাক্য সাজিয়ে তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা নকশার মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। সাহিত্যিক হলে লেখার বাঁধুনি কিংবা সঠিক শব্দ চয়নে অনেক বিশেষণ বা আবেগ হয়তো এড়াতে পারতাম। অনেক ক্ষেত্রে আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। বিধানদা ক্ষমা করবেন।

এই পর্বের মনের মানুষ একজন আইনজীবী যিনি আপাত অসম্ভব কাজকেও সম্ভব করতে পারেন।

পথ দেখালেন নবকুমার

খুব ইচ্ছে ছিল একবার মুখোমুখি বসে কথা বলে অতীতটা জানার।

এতদিন মুচমুচে খবর হিসেবে ওঁকে নিয়ে যা লিখেছি সেটা হয় পুলিশ সূত্রের থেকে পাওয়া, কিংবা আদালতের সাক্ষ্য থেকে নেওয়া। তখনও কোনোও সাংবাদিকের সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলেননি। বলার কথাও না। কারণ, খাদিম-কর্তা পার্থ রায়বর্মন অপহরণ মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ার পরে শর্তই ছিল মুখ না খোলার। যাত্রা দলে নাম লিখিয়ে পেট চালানোর ব্যবস্থা করে নিয়েছিলেন। কারও দয়ায় বাঁচতে চাননি স্বাতী পাল।

খাদিম-কর্তা অপহরণ মামলার খবর লিখে লিখে স্বাতী পালের অতীত বর্তমান সম্পর্কে সব জানা হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মুখোমুখি বসে একবার কথা বলব না? যা এতদিন শুনেছি তার শতকরা ৯০ ভাগই পুলিশের বয়ান থেকে। শতকরা ১০ ভাগ আদালতের সাক্ষ্য থেকে।

কি ভাবে স্বাতী পালের সঙ্গে দেখা করা যায়? একবার দেখা হলে কথা বলতে সমস্যা হবে না।

মুশকিল আসান কল্যাণদা (দাশ)। আইনের স্নাতক কল্যাণদা আমাদের আলিপুর আদালতের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করছেন দীর্ঘদিন। সব আইনজীবীরা ওঁর ঘনিষ্ঠ। খাদিম মামলার (পার্থ রায়বর্মন অপহরণ মামলা ) সরকারি আইনজীবী ছিলেন নবকুমার ঘোষ। রাজসাক্ষী হওয়ার সুবাদে বেশ কয়েকবার স্বাতীকে নবদার সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান কথা বলতে হয়েছে। কল্যাণদার সঙ্গে দহরম মহরম রয়েছে নবদার। কোনও কারণে কল্যাণদা আলিপুর আদালতে যেতে না পারলে নবদা আমাকে ফোন করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি বা রায়ের বিষয়টা বলে দিতেন। কল্যাণদাই আমাকে নবদার সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছিলেন।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। কল্যাণদা একদিন নবদাকে ফোনে ধরিয়ে দিলেন। নবদা প্রথমেই বললেন, ‘দেখুন ভাই আপনি ওঁর সঙ্গে এই মামলা নিয়ে কথা বললে নিজেই কেস খাবেন। আদালত অবমাননার মামলা হয়ে যাবে।’ কথায় কথায় যেটা বেরিয়ে এলো যে সাংবাদিক হিসেবে আমি কথা বলতে পারব না স্বাতীর সঙ্গে। লেখাতো দূরের কথা। নবদাকে বললাম, ‘লেখার দরকার নেই। আপনি চাইলে আমি দুটো কথা বলতে পারি। যাঁকে নিয়ে এত লিখলাম, তাঁর সঙ্গে একবার মুখোমুখি বসে কথা বলতে পারব না?’

নবদা কিন্তু অনুরোধ খারিজ করে দিলেন না, বললেন, ‘ভেবে দেখতে দিন।’ শেষ পর্যন্ত পথ দেখালেন নবদাই। এক শুক্রবার কল্যাণদা আদালত থেকে ফিরে বললেন, ‘পথ একটা পেয়েছি। কাল সকালেই আমরা যাব স্বাতী পালের বাড়িতে। অফিসের ‘প্রেস’ লেখা গাড়িতে যাওয়া চলবে না। যাব আমরা চারজন। তুমি, আমি আর নববাবু আইনজীবী হিসেবে। আর যাবেন এই মামলার তদন্তকারী অফিসার (সিআইডি) রশিদ। রশিদ তোমাকে চেনে। তাই সমস্যা নেই। তোমাকে নবকুমারের সহকারী বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে।’

পরিচয় গোপন করে সাক্ষাৎকার আগে একবার নিয়েছি। দমদমের দোর্দন্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতা দুলাল ব্যানার্জির সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়। বরানগর পুরসভার নির্বাচন হবে শেষ হয়েছে। আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় ছবি বেরিয়েছে, এক আইপিএস অফিসারকে আঙুল তুলে হুমকি দিচ্ছেন একজন। যে ব্যক্তি হুমকি দিচ্ছেন, তিনিই দুলাল ব্যানার্জি। আনন্দবাজারের বিরুদ্ধে রাগে ফুটছেন সিপিএমের কমরেডরা। সামনে পেলে জ্যান্ত চিবিয়ে খাবে। ওই ছবি দেখে শাসক দলের একটি গোষ্ঠী দুলাবাবুর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে। আমাকেই বলা হল দুলালবাবুর সাক্ষাৎকার নিয়ে আসতে।

আমি গাড়ি কাশীপুর থানার ভিতরে রেখে দুলাল ব্যানার্জির বাড়ি খুঁজতে বেরোলাম। দু’বার জিজ্ঞাসা করতেই পৌঁছে গেলাম গলির মুখে। গলি দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকের তৃতীয় বাড়িটাই দুলালবাবুর। বেল বাজাতেই হাতাওয়ালা সাদা গেঞ্জি আর পায়জামা পরা যিনি দরজাটা খুললেন তিনি পুলিশকে আঙুল তুলে হুমকি দেওয়া সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ সিপিএম নেতা। কাগজে বেরোনো ছবিটা মনে গেঁথে আছে যে!

জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি চাই?’

মিথ্যা পরিচয় দিলাম। অন্য কাগজের নাম বললাম।

‘ও আপনিই দু-তিন জায়গায় আমার বাড়ির খোঁজ করছিলেন? আমাকে ফোনে ওরা জানিয়েছে। কে একজন অপরিচিত লোক আমার বাড়ি খুঁজছেন,’ ঠান্ডা গলায় বললেন দুলালবাবু।

অর্থাৎ আমার উপরে নজরদারি চলছিল। গাড়িটা কাশীপুর থানার ভিতরে রেখে এসে কতটা যে সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলাম সেটা বুঝতে পারলাম। আমাকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলেন। বারান্দায় বসে চার-পাঁচ মিনিটের কথা-বার্তা। যে প্রশ্নগুলি ছিল সেগুলির জবাব অবশ্য পেয়ে গিয়েছি। উনি চা না খাইয়ে ছাড়বেন না। আমি আর বসব না। বার বার ঘড়ি দেখছি। বললাম, ‘আমার দেরি হয়ে যাবে। আজ বরং যাই।’ উনি আর আপত্তি করলেন না। আমি তখন ঘামতে শুরু করেছি। বাড়ির দরজা খুলেই দেখলাম একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। পিছন ফিরে আর দেখলাম না। রিকশা নিয়ে দমদম স্টেশন। সেখান থেকে একটা বাসে চেপে ফিরলাম বিটি রোড। সেখান থেকে কাশীপুর থানা। গাড়ি নিয়ে সোজা অফিস।

দুলাল বাবু আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন আজকালের খবরটা কী ভাবে বেরোবে তা যেন আমি ওঁকে ফোন করে জানাই। আমি অফিসে পৌঁছে আমার অভিযানের কথা সবিস্তারে বললাম। তারপরে দুলালবাবুকে ফোন করে নিজের আসল পরিচয় দিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিলাম। ফোনের ওপাশ থেকে আমার উদ্দেশে কি কি বিশেষণ বর্ষিত হচ্ছিল তা সহজেই অনুমেয়।

স্বাতী পালের বাড়িতে সে সব ঝুঁকি অবশ্য নিতে হয়নি। শুধু আফসোস একটাই, কিছু লিখতে পারব না। নবদা, রশিদ আর কল্যাণদা গোটা রাস্তাটা আমাকে নিয়ে পড়লেন। আমার পরিচয় যাতে কোনওভাবেই প্রকাশ না হয়ে পড়ে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলছিলেন সবাই। কারণ তখনও ওই মামলার সব অভিযুক্তকে ধরা সম্ভব হয়নি। ফলে মামলা তখনও সজীব (এখন অবশ্য নিম্ন আদালতে মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে)।

আমরা নির্দিষ্ট সময়েই রাজারহাটের নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে গেলাম। তিনতলার একটা ফ্ল্যাট বাড়ি। দোতলায় উঠে বাঁ দিকের ফ্ল্যাটে স্বাতী তাঁর স্বামীর সঙ্গে থাকেন। ফ্ল্যাটের সামনে আসতে দেখলাম একটা বেঁটে মতো ছেলে দরজা খুলে বেরিয়ে আসছে। রশিদ কানে কানে বললেন, ‘এই ছেলেটাকেই স্বাতী আবার বিয়ে করেছেন। এই বিয়ে করাটা খুব দরকার ছিল। না হলে টিঁকতে পারত না।’

স্নান করে আটপৌড়ে শাড়ি পরে স্বাতী আমাদের সামনে এসে বসলেন। সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন নবদা। আমি ওঁর সহকারী। অন্য একটা মামলার বিষয়ে কথা বলার জন্য নবদার সঙ্গে বেরিয়েছি। সেখানে যাওয়ার পথে এখানে নিয়ে এসেছেন। এ কথা সে কথার মধ্যে উঠে গেলেন স্বাতী পাল। সহায়িকার সঙ্গে সঙ্গে হাতে হাতে চলে এল লুচি, তরকারি, অমলেট। নবদা আর রশিদকে দাদার মতো যত্ন নিয়ে খাওয়ালেন। আমি আর কল্যাণদা শুধু সঙ্গে আছি। শুধু খেয়েই যাচ্ছি।

আমি শুধু ভাবছি নবদা নিশ্চয়ই কোনও একটা উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন। তাই রশিদকে নিয়ে এসেছেন সঙ্গে করে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে নবদা এবার উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার করলেন। মূলত স্বাতীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে খাদিম-মামলায় আফতাব আনসারি-সহ পাঁচ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে আগেই। ধৃত আরও সাত অভিযুক্ত – আসলাম খান, দিলশাদ, নঈম, মোজাম্মেল শেখ, শেখ মিজানুর, আখতার মৌলানা ও নূর মহম্মদ শাহবাজের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেখানে স্বাতীই মূল সাক্ষী। সেই ব্যাপারেই কথা বলতে আসা।

নবদা স্বাতীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। রশিদ ফাইলে চোখ বুলোচ্ছিলেন। সম্ভবত স্বাতীর আজকের কথার সঙ্গে ফাইলে থাকা তথ্য মিলিয়ে দেখছিলেন। প্রয়োজনে স্বাতীকে বক্তব্য বদলাতে হতে পারে। কথা বলতে বলতে নবদা আমার দিকে ফিরলেন, ‘আমাকে সাহায্য করার জন্য তো এখানে আসা। একটা প্রশ্নও তো করতে দেখলাম না।’ নবদা আমার দিকে বলটা বাড়িয়ে দিলেন। এবার গোল করা উচিত আমার।

আমি এতদিন স্বাতী পালকে নিয়ে যে কয়েক হাজার শব্দ লিখেছি তার সঙ্গে বাস্তবের মিল কতটা তা মিলিয়ে নেওয়ার কৌতূহল নিবৃত্ত করতেই আমার আসা। প্রশ্নগুলি সেইভাবেই সাজিয়ে এনেছিলাম। আমি প্রশ্ন করছি উত্তর দিয়েছেন স্বাতী। মাঝে মন্তব্য করেছেন, ‘এগুলি তো কোর্টেও বলেছি।’ নবদা আবার রক্ষাকর্তার ভূমিকায়, ‘এবার সাক্ষ্য দিতে গিয়ে যাতে কোনও অসঙ্গতি না ধরা পড়ে তাই এসব প্রশ্ন।’

আমারতো সব মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। সাধারণ ঘরের এক অতি সাধারণ মেয়ে। ব্যারাকপুরে নোনাচন্দনপুরে বাপের বাড়ি। তাঁর কাহিনি অবশ্য আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো নয়। ষোল বছর বয়সে বর্ধমানের এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে। ভাগ্য অন্বেষনের জন্য মুম্বাই পাড়ি দেন তরুণ ওই দম্পতি। কিন্তু সেই স্বামীই তাঁকে হোটেলের নাচ গানের পেশায় নামিয়ে দিলেন। তারপরে একদিন উধাও। হোটেলে নাচগানের আসর থেকে দুষ্কৃতী যোগ। একদিন ‌দুবাই পাড়ি। রাজু ভাইয়ার (আফতাব আনসারি) সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। জুটত শারীরিক নিগ্রহও। ফারহান ভাই ওরফে আফতাবের নির্দেশেই মুম্বাই ফেরা। তারপরে সেখানকার হোটেল থেকে ধরা পড়া। লেখার সঙ্গে স্বাতীর বয়ান কিন্তু মিলে যাচ্ছিল। উনিশ বিশ তো থাকেই।

বলার সময় একবারও চোখ ছলছল করল না ওই নর্তকীর। হয়তো বার বার এই কাহিনি শোনাতে শোনাতে এখন আর কান্না আসে না স্বাতীর।

এখন কেমন আছেন? বিদায় দেওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘জলসায় গান গাই। যাত্রাও করি।’

পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে না?

‘যখনই এই মামলার শুনানি আসে, পুরনো কথাগুলো মনে পড়ে। দুঃখ হয়।’

পাড়ার লোকজন, প্রতিবেশীরা আড়ালে কিছু বলেন না?

এবার চোখ ছলছল করে উঠল স্বাতীর, ‘ সমাজের অনেকে, এমনকী পাড়া-পড়শিদের কেউ কেউ এখনও আমায় অপরাধী হিসেবে দেখেন! জানি না, জীবদ্দশায় দাগটা মুছবে কি না!’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here