দেবদূত ঘোষঠাকুর # মনের মানুষ-২৫

0
20

দেবদূত ঘোষঠাকুর

মনের মানুষ-২৫

গল্পকার বা সাহিত্যিক হওয়ার বিন্দুমাত্র বাসনা আমার কখনও ছিল না। এখনও নেই। নিজে বরাবর থাকতে চেয়েছি একজন কাটখোট্টা রিপোর্টার হিসেবে। খবরটি পাঠকের পাতে তুলে দেওয়ার জন্য অনেক ক্ষেত্রে আবেগের মাত্রা চড়িয়েছি।

পরে কাগজে দেখেছি আবেগের অংশটা এডিট হয়ে গিয়েছে। আমার প্রথম চিফ রিপোর্টার বিধান সিংহ একদিন কাছে ডাকলেন। কেটে কেটে বললেন,’এটা কি সাহিত্য হচ্ছে!খবর আর সাহিত্য এক নয় কিন্তু। আবেগ হল শরীরে চর্বির মতো। বাদ দিতে হয়। লেখা হবে মেদহীন।’

তারপর একটু গলা চড়িয়ে বললেন, ‘তুই তো কিছুই শিখছিস না। রোজ আবেগের অংশগুলি কেটে বাদ যাচ্ছে। কেন এ ভাবে তোর লেখার একটা অংশ কেটে বাদ যাচ্ছে তা নিয়ে কখনও কিছু জানতে চাসনি।’

কিন্তু এখন স্মৃতির পাতা ধরে ধরে টান দিতে গিয়ে রিপোর্টার সুলভ লেখা পুরোপুরি বেরোচ্ছে না। বিশেষ করে আমার তিন দশকের বেশি সময় রিপোর্টিং করার সুবাদে এমন কিছু মানুষের খোঁজ পেয়েছি যাঁরা ‘সোর্স’ থেকে পরম আত্মীয় হয়ে উঠেছেন।

তাঁদের কথাই আমার এই ‘নকশি কাঁথা’-র অন্যতম মূল নকশা। সুতোর ফোঁড় নয়, কিছু বাক্য সাজিয়ে তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা নকশার মতো উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। সাহিত্যিক হলে লেখার বাঁধুনি কিংবা সঠিক শব্দ চয়নে অনেক বিশেষণ বা আবেগ হয়তো এড়াতে পারতাম। অনেক ক্ষেত্রে আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। বিধানদা ক্ষমা করবেন।

এই পর্বের মনের মানুষ একজন জেলার চিকিৎসক। আমরা শুনব তাঁর স্বপ্ন পূরণের আখ্যান।

পার্থ এবং সারথি

কোনও একটা অ্যাসাইনমেণ্ট থেকে সবে অফিসে ফিরে লিখতে বসেছিলাম, নিজের ঘরের বাইরে বেরিয়ে সুমনদা (সুমন চট্টোপাধ্যায়, তখন আনন্দবাজার পত্রিকার একজিকিউটিভ এডিটর) হাঁক পাড়ল, ‘দেবদূত, আমার ঘরে একবার আয় তো!’

মাথা না তুলেই গলা চড়িয়ে জবাব দিলাম, ‘কপির ইণ্ট্রোটা লিখে আসছি।’ গলা না চড়ালে উপায় ছিল না। সুমনদার ঘর থেকে রিপোর্টিংয়ে যেখানে বসতাম তার দূরত্ব বেশ খানিকটা হবে। সুমনদা ইণ্টারকমের ধার ধারত না। নিউজ ডিপার্টমেণ্টে কাউকে দরকার পড়লে এ ভাবেই হাঁকডাক করত।

হঠাৎ হঠাৎ উচ্চস্বরে ‘রজত’ (রায়, তখন নিউজ এডিটর), ‘দেবদূত’, ‘হীরক’ (বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন জেলার চিফ্ রিপোর্টার), ‘মামা’ (দেবাশিস ভট্টাচার্যকে আমরা এই নামেই ডাকতাম), ‘ঝুমরু’ (তখনকার বিজনেস এডিটর সুপর্ণ পাঠকের ডাকনাম), ‘মনা’ (স্পোর্টস রিপোর্টার সব্যসাচী সরকার) – ডাক শুনে পিলে চমকে যেত। একবারে সাড়া না দিলে আগে পেছনে বিস্তর বিশেষণ যোগ হত। সবার শোনার জন্যে। বয়সে যাঁরা বড় ছিলেন, তাঁদের কিংবা বিভাগের সহায়ক কর্মীদের সঙ্গে অবশ্য কখনই হাঁকডাক করে কথা বলত না সুমনদা।

কোনও অ্যাসাইনমেণ্ট থেকে ফেরার সময়েই লেখার ইণ্ট্রোটা ( ইণ্ট্রোডাকশনের সংক্ষেপ) অর্থাৎ শুরুটা ভেবে রাখতাম। তখন মোবাইল বা‌ টেবিলে টেবিলে কম্পিউটারের চল হয়নি। হাতেই লিখতাম। তাই ফিরেই আগে ভেবে রাখা ইণ্ট্রো অর্থাৎ ইণ্ট্রোডাকশনটা লিখে রাখতাম। একবার ইণ্ট্রো লেখা শেষ হলে ‘কপি’ (লেখা) দৌড়ত হৈ হৈ করে।

অনেক সময় কপির শেষটাও আগে থেকে ভেবে রাখতাম, যাতে তা পাঠকের মনে দাগ কেটে যায়। রেশটা অনেকক্ষণ থেকে যায়।

সেই দিনটাতে কপির একটা নাটকীয় ইণ্ট্রো দরকার ছিল। সেটা লেখা সবে শেষ হয়েছে, ফের সুমনদার হাঁক। এবার সঙ্গে বিশেষণ। আমি জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। ইণ্ট্রো লেখা কাগজটা হাতে নিয়ে উঠলাম। সুমনদা প্যাণ্টের কোমরটা দু’দিকে দু’হাত দিয়ে ধরে ওপরের দিকে তুলতে তুলতে বলল, ‘আমাকেও পাত্তা দিচ্ছিস না! ভালো।’ ততক্ষণে আমি সুমনদার ঘরের সামনে। দেখলাম সোফায় একজন বসে আছেন। দোহারা চেহারা। ধোপদুরস্ত পোশাক। চকচকে জুতো। গলায় টাই।

সুমনদা পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, ‘পিজির (এসএসকেএম হাসপাতাল) নামকরা গ্যাসট্রোএণ্টেরোলজিস্ট অভিজিৎ চৌধুরী। ওর বাবা অরুণ চৌধুরী। সিপিএমের বীরভূম জেলা কমিটির সম্পাদক। অভিজিৎ লিভার নিয়ে কাজ করে। কি একটা বিষয় নিয়ে লেখার কথা বলছে। ওর সঙ্গে কথা বল। ফিজিওলজি নিয়ে তো ফটফট করিস খুব। কেমন জ্ঞান তা বোঝা যাবে আজই।’ ডাঃ চৌধুরীকে সুমনদা ‘তুই তুই’ করে সম্বোধন করছিল। আমাকে বলল, ‘আমাদের থেকে অনেক ছোটো। ওকে আপনি আজ্ঞে করিস না।’ এটাই সুমনদার নিজস্ব স্টাইল (পুনশ্চ পড়ুন)।

অভিজিৎ চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ সেদিন থেকেই। সুমনদার অনুমতি পেয়ে প্রথম দিনেই তুই। অভিজিৎ আপনি, আজ্ঞে ছেড়ে তুমি। পরদিনই ওর এসএসকেএম হাসপাতালের চেম্বারে যাব বলে ঠিক হল। বিষয়টা শুনে নিলাম- হেপাটাইটিস বি। যাক, আমার সিলেবাসের মধ্যে! তবুও একবার বায়োকেমিস্ট্রি বইটায় রাতে চোখ বুলিয়ে নিলাম। পরদিন এসএসকেএম হাসপাতালে গিয়ে দেখি যেখানে অভিজিতের ঘর সেখানে আশেপাশে সবাই আমার চেনা লোকজন। ওদের বিভাগীয় প্রধান ডাঃ দেবেন্দ্রনাথ গুহমজুমদারের সঙ্গে আমি একসঙ্গে আর্সেনিক দূষণাক্রান্ত গ্রামে গেছি। একবার নয়। বেশ কয়েকবার। ঢাকায় বাঙলাদেশে আর্সেনিক দূষণ সংক্রান্ত একই আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে বক্তব্য রেখেছি। ওই বিভাগের ডাঃ জয়ন্ত দাশগুপ্ত (জয়দা) আমার পাড়ার ছেলে। বায়োকেমিস্ট সামন্তদা (নামটা মনে পড়ছে না) আমাদের ফিজিওলজির সিনিয়র দাদা। অভিজিৎ অবশ্য আমার এই পূর্বপরিচিতির এত কিছু জানত না।

অফিসে ফিরেই লিখে ফেললাম। আমার ফিজিওলজির বিদ্যা, অভিজিতের ব্যাখ্যা আর কেস স্টাডি মিশিয়ে। মনে আছে পরদিন প্রথম পাতায় বাঁ দিকের প্রথম কলামে লেখাটা বেরিয়েছিল। সুমনদা অফিসে এসে আমার কাছে চলে এল। বলল, ‘ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে পাশ করে গেলি কিন্তু। অভিজিৎ ফোন করেছিল। বলল, ও নিজে এত ভালো বোঝাতে পারত না।’ সেই থেকে অভিজিতের সঙ্গে জুড়ে গেলাম। ও এমন একজন বিরল চিকিৎসক যে, চিকিৎসা করত, পাশাপাশি আবার গবেষণাও করত। নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলেই আমার কাছে নিয়ে আসত। আমি লিখে ফেলতাম।

অভিজিতের কাছে রোগী পাঠাতাম যখন তখন। ওর একটাই আবেদন, ‘বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আসা ঘাঁটা কেসগুলো দয়া করে পাঠিও না। এতে অন্য ডাক্তারের সঙ্গে, রোগীর সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থাকে।’ বেশ মজার প্রেসক্রিপশন‌ লিখত অভিজিৎ। একজন পেটের অসুখে ভুগছিল অনেকদিন ধরে। অফিস কামাই করতে হচ্ছিল মাঝেমধ্যেই। অভিজিতের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। ও এসএসকেএম হাসপাতালে নিজের ঘরে বসে রোগী দেখত। সেই রোগী আমাকে ফোন করে বললেন, ‘ডাক্তারবাবু বেশ অনেকক্ষণ ধরে যত্ন নিয়ে দেখেছেন।’ জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সিরিয়াস কিছু?’ ওই রোগী বললেন, ‘ডাক্তারবাবু প্রেসক্রিপশনে বড় বড় করে লিখে দিয়েছেন, ‘পেটে কোনও রোগ নাই।’ ‘তাহলে রোগ কোথায়’, জিজ্ঞাসা করলাম। ‘ডাক্তারবাবু বলেছেন, রোগটা মনের। মন ভালো রাখতে বলেছেন।’

আর একজন রোগী অসমের। পেটে ব্যথা। এক চিকিৎসকের পরামর্শে ইঞ্জেকশন পর্যন্ত নিয়েছেন। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। অভিজিৎকে অনেক অনুরোধ করার পরে ও দেখতে রাজি হল। ওই রোগী পরে আমাকে ফোন করে বললেন, ‘জীবনে এত ধমক কখনও খাইনি। সব ওষুধ বন্ধ করে দিয়েছেন। বলেছেন সব খেতে। আনন্দে থাকতে।’ ওই রোগীর প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়েছে, ‘কোনও ওষুধের দরকার নাই।’

নরেন্দ্রপুরের এক প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক পেটের অসুখের ভয়ে সবরকম খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। তরকারি পর্যন্ত ধুয়ে খেতেন। কিছুতেই ভালো ডাক্তার দেখাবেন না। আমি অভিজিৎকে ধরে নিয়ে গেলাম। অভিজিৎ সব পরীক্ষা করল। প্রধান শিক্ষক (মহারাজের) সঙ্গে কথা বলল। তারপরে রসিকতা বলল, ‘মহারাজ, এবার থেকে ভাতটাও ধুয়ে খাওয়া অভ্যেস করুন।’ তারপরে বলল, ‘কিছু না খেয়ে অপুষ্টিতে ধরেছে। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবারে ফিরে এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

রোগী দেখার পাশাপাশি অভিজিৎরা লিভারের গবেষণার জন্যে এরপরে তৈরি করল ‘লিভার ফাউণ্ডেশন’। তার মাথায় যিনি বসলেন সেই ডাঃ অশোকানন্দ কোনার আমার স্কুলের সিনিয়র দাদা। আমি মানসিকভাবে জুড়ে গেলাম ওই সংস্থার সঙ্গে, তার জন্মলগ্ন থেকে। কোনও একটা রথের গতি সামাল দিতে সবসময় যেমন একজন দক্ষ সারথির প্রয়োজন হয়, তেমনই অভিজিতের গড়া ওই সংস্থার প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাতে একজন সারথির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। অভিজিৎ একদিন বলল, ‘দেবদূতদা, একজনকে পেয়ে গেছি। ছেলেটা পুরুলিয়ার।’ একদিন গিয়ে দেখলাম, আরে, এতো পার্থ। রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে ফিজিওলজি বিভাগে আমার থেকে এক যুগের বেশি জুনিয়র ডঃ পার্থ মুখোপাধ্যায়।

পার্থ এসএফআই করত। বিজ্ঞান কলেজে ওর দাপট ছিল দেখার মতো। এসএফআইয়ের রাজকীয় নেতারা পর্যন্ত সমীহ করতেন আমার এই অনুজকে। পিএইচডি করার পরে ওর একাধিক চাকরির ব্যবস্থা করেছিল ওর দল সিপিএম। কিন্তু পার্থর এক কথা, ‘আমি কিছু পাওয়ার আশায় চাকরি করিনি।’ মেরুদণ্ড সোজা রাখা এই ছেলেটার সন্ধান অভিজিৎকে কে দিল তা দু’জনের কাউকেই জিজ্ঞাসা করতে পারিনি কখনও। পার্থ যোগ দেওয়ার পরে লিভার ফাউণ্ডেশনের গবেষণার গতি ও পরিধি বেড়ে গেল। আমারও যাতায়াত বাড়ল।

লিভার ফাউণ্ডেশনের একটা গবেষণাপত্রের উল্লেখ না করে পারছি না। রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের কমিউনিটি মেডিসিনের ক্লাস নিতে গিয়ে আমি সবসময় ওই গবেষণাটার উল্লেখ করেছি। লিভারের একটা সমস্যা নিয়ে আমাদের যে ভুল ধারণা এতদিন ছিল সেটা অভিজিৎদের ওই গবেষণায় পুরোপুরি ভেঙে গেছিল। জানা গেছিল, গ্রামের যে সব লোকজন গায়েগতরে খেটে খান, তাঁদের লিভারেও চর্বি জমে (ফ্যাটি লিভার)। যাঁরা মদ্যপান করেন, আর যাঁরা করেন না সবারই ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি জনমজুর খাটা মহিলারাও ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হতে পারেন। এটা কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষের জিনগত সমস্যা কি না, অথবা তার ভৌগলিক অবস্থানের ওপরে নির্ভর করে কি না তা আরও গবেষণাতেই ধরা যাবে। অভিজিৎদের ওই সমীক্ষাটা বীরভূমের মানুষের ওপরে করা হয়েছিল। লিভার সংক্রান্ত গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করল লিভার ফাউণ্ডেশনের এই সমীক্ষা। এরপরে সমীক্ষার কাজেও গতি বাড়িয়ে দিল লিভার ফাউণ্ডেশন।

এর পাশাপাশি ‘সুস্থ লিভার, সুস্থ জীবন’ সংক্রান্ত জনস্বাস্থ্যমূলক আলোচনাচক্র ও প্রশিক্ষণ শুরু করে দিল লিভার ফাউণ্ডেশন। তার নেতৃত্বে পার্থ। অভিজিৎ সামলাচ্ছিল চিকিৎসা আর গবেষণার কাজ আর জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রচার আর প্রশিক্ষণের দায়িত্ব নিল পার্থ।‌ এসবের মধ্যেই ফাউণ্ডেশন লিভার সংক্রান্ত চিকিৎসার জন্যে একটা হাসপাতাল তৈরির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। অভিজিৎ হল যুদ্ধের সেনাপতি অর্জুন আর তার সারথির ভূমিকা গ্রহণ করল পার্থ। ওদের যুগলবন্দিতে রথের ঘোড়া উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়তে লাগল। দেখতে দেখতে মানুষের দানের টাকায় দক্ষিণ ২৪-পরগণার সোনারপুরে মাথা তুলে দাঁড়ালো লিভার হসপিটাল। স্বপ্ন সফল হল অভিজিৎ-পার্থের।

রবীন্দ্রনাথ একবার বাঙালীদের সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘আমরা আড়ম্বর করিয়া শুরু করি কিন্তু শেষ করি না।’ লিভার ফাউণ্ডেশনের অভিজিৎ ও তার সারথি পার্থ প্রমাণ করে দেখাল ব্যতিক্রমী বাঙালিও কিন্তু আছে।

পুনশ্চ: ফোনে খবর সংগ্রহ করার স্টাইল এক এক রিপোর্টারের একেকরকম ছিল। যার যেমন স্টাইল। মনে রাখতে হবে, তখন কিন্তু মোবাইল ছিল না। ফলে নম্বর সেভ করার গল্পও ছিল না যে স্ক্রিনে নাম ফুটে উঠবে। সুদেবদা চেনা অচেনা সবাইকেই ফোন করে শুরুতেই বলতেন, ‘অধমের নাম সুদেব রায়চৌধুরী।’ ‘কোনও খোঁজখবর করাই তো ছেড়ে দিয়েছেন। আমি সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত’, – এটা ছিল সুখরঞ্জনদার নিজস্ব স্টাইল। ‘স্যার, আমি আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে সুপ্রকাশ চক্রবর্তী বলছি। আপনার ওপরে কিন্তু চাকরি থাকা না থাকা নির্ভর করছে’, সুপ্রকাশদা এই স্টাইলে বাক্যালাপ শুরু করতেন। সুপ্রকাশদা সবাইকেই স্যার এবং আপনি করে বলতেন। ‘হেঁ হেঁ খবরটা চেপে গেলেন? ভাবলেন পাব না, তাই তো! আমি বাগনান থেকে সুফল সরকার বলছি’, এটাই ছিল সুফলদা স্পেশাল। ফোনের মাউথপিসে মুখটা চেপে ধরে কেউ আবার বলতেন, ‘আমি দেবাশিস ভট্টাচার্য।’

অভীকবাবু বাইরে থেকে কেউ ফোন করলে জানতে চাইতেন, ‘কে বলছেন?’ উনি আশা করতেন সবাই ওঁর গলা চিনবে। এপার থেকে নাম বললে বলতেন, ‘আমি অভীকবাবু বলছি। অমুক আছে?’ একবার আমাদের দেবীদাস আচার্য ফোন ধরে প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলেছিল, ‘তাহলে তো আপনার নামটাও বলতে হয়।’ বিন্দুমাত্র রেগে না গিয়ে অভীকবাবু সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি অভীক সরকার বলছি।’ যদিও পরে এ নিয়ে কাউকে কিছু বলেন নি। উষ্মাও প্রকাশ করেননি।

এখন সোর্সদের নম্বর ও জরুরি সব নম্বরই সবার মোবাইলে স্টোর করা থাকে। তাই ল্যাণ্ডলাইনে নিজেকে প্রকাশ করার সেই মজাটাই আর নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here