বীরভূমে আজ থেকে শুরু ঐতিহ্যবাহী জয়দেব মেলা

0
140

নিজস্ব প্রতিনিধি :বীরভূম: – আজ বীরভূমে ইলামবাজারে অজয় নদের তীরে শুরু হচ্ছে জয়দেব-কেঁদুলির মেলা। এই মেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছে। মেলাজুড়ে বসানো হয়েছে সিসিটিভি, ওয়াচ টাওয়ার।

এইবছরে পুলিশের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। এমনকি স্নান ঘাটেও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছে।

জানা গেছে, অজয় নদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কবি জয়দেবের নাম। সময়, কাল নিয়ে নানারকম মত থাকলেও দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই মকর সংক্রান্তীতে বীরভূমে ইলামবাজারে আয়োজন করা হয়ে আসছে জয়দেব-কেঁদুলির মেলা। আনুমানিক ৮৭৫ বছর আগে লক্ষন সেন এই মেলার সূচনা করেন। উদ্দেশ্য, তাঁর সভাকবি জয়দেব কে স্বরণে রাখা।

কথিত আছে,কবি জয়দেব প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে মকরস্নান করতে যেতেন কাটোয়ার গঙ্গায়। এক বার তিনি এমন অসুস্থ হয়ে পড়েন যে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেন তাঁর জন্য মা গঙ্গা উজান বেয়ে অজয় নদে এসে মিলিত হবেন। তাই অজয় নদে স্নান করলেই গঙ্গাস্নানের ফল পাবেন জয়দেব। লোকমুখে তখন এই আশ্চর্য কথা রটে যেতেই অজয় নদীতে পুণ্যস্নান করেন এলাকার বাসিন্দা থেকে শুরু করে দূর দূরান্ত থেকে আসা পূরণার্থীরা। তখন থেকেই বীরভূমে ইলামবাজারে অজয় নদের তীরে জয়দেব কেঁদুলিতে মকর সংক্রান্তিতে ভিড় বাড়ে। বসে মেলা। এই মেলার কথা ও পুণ্যস্নানের কথা ছড়িয়ে পড়ে জেলা ও রাজ্যের গণ্ডী ছাড়িয়ে বিদেশেও। সে কারণেই জেলা, রাজ্য এমনকি বিদেশের অনেক ভক্ত পৌষ সংক্রান্তি মেলায় ভিড় করেন বীরভূমে ইলামবাজারে অজয় নদের তীরে জয়দেব কেঁদুলির মেলায়।

এই বছরের এই মেলায় কীর্তন ও বাউলের টানে জয়দেব কেঁদুলির মেলায় আখড়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন, ব্রাজিলের মিস গাবি আর ইতালির মার্স ও লরেন্সরা।
ইতালির মার্স জানান, “আমরা জয়দেব মেলায় হাজির হয়েছি কীর্তন ও বাউলের টানে। আমরা দেখেছি কনকনে শীতকে উপেক্ষা করেও কী করে পূরণার্থীরা অজয় নদীতে স্নান করছেন”।

জয়দেব কেঁদুলির আশ্রমের উপদেষ্টা অপু লায়েক মহারাজ জানান, “আজ ভোর থেকেই পূন্যস্নান শুরু হয়ে গিয়েছে। মেলার দুইদিন আগে থেকেই ভক্ত দের আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।আজ থেকে মেলা শুরু। সকাল থেকেই মেলার বিভিন্ন আশ্রমে বাউল, কীর্তন, কবি ইত্যাদি অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে। সকাল থেকেই মেলা দর্শনার্থীদের ভিড় রয়েছে চোখে পড়ার মতো। পাশাপাশি রাধাগোবিন্দের মন্দিরেও ভক্ত দের ভিড় শুরু হয়ে গেছে। এই জয়দেব মেলা তিনদিন ধরে চলবে। এই মেলায় বাউলের রয়েছে অনেক আখড়া। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবছরের আখড়ার সংখ্যা অনেক বেড়েছে। ওই আখড়ায় মেলা দর্শনার্থীরা এসে থাকেন ও অনুষ্ঠান, মেলা দেখার পাশাপাশি তিনদিন ধরে মহোৎসব সেবন করেন”।

মেলা কমিটির সভাপতি পরিতোষ চক্রবর্তী জানান, “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে গতবছর থেকে আমাদের আখড়ায় জায়গায়, জল ও আলোর জন্য কোনো কড় লাগে না। আমাদের আবেদন, ছোটো, ছোটো আখড়ার ছাউনি নির্মাণের জন্য আর্থিক সাহায্য করলে মানুষ উপকৃত হবে। সেজন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই টাকার বরাদ্দ দিক”।

বোলপুর মহকুমা শাসক অভ্র অধিকারী জানান, “এই মেলাটি যাতে সুন্দর ভাবে হয় সেজন্য আমরা রাতদিন পরিশ্রম করে চলেছি। এই বছরের এই মেলায় বড়ো স্টল থাকছে ৪০০ টি। আখড়া থাকছে ২৭৫ টি। এছাড়াও ছোটো স্টল থাকছে অগুনতি। আমাদের এইবার জয়দেব কেঁদুলির মেলার মূলমন্ত্র হচ্ছে ‘পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠুক মেলা প্রাঙ্গণ’। সেইজন্য গতবছরের তুলনায় এইবছর অনেক মহিলা, পুরুষ শৌচাগার তৈরি করা হয়েছে। এমনকি প্রতিটি শৌচাগারে আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আখড়া ও মেলা যাতায়াতের রাস্তাও প্রসারিত করা হয়েছে। গোটা মেলা জুড়ে প্লাস্টিকের জিনিস বন্ধ করার জন্য প্রচার চালানো হচ্ছে। অগ্নি নির্বাপনের জন্য মেলায় দমকল ইঞ্জিন পৌঁছাতে যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেইদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। এই মেলায় শব্দ দূষণ রুখতে মেলায় লাউড স্পিকারের ব্যাবহার কম করা হয়েছে। মেলায় স্নানের ঘাট করা হয়েছে ছয়টি। সঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলোর ব্যবস্থা। নদীতে জল কম থাকায় পূরণার্থীরা স্নান করতে একটু অসুবিধা হয়েছে এমনকি হবেও। যদিও নদীতে জল কম থাকার জন্য আমরা সেচ দফতরে চিঠি করেছিলাম। ওনারা জানিয়েছিলেন, হিংলো জলধারে জল না থাকায় জল দিতে পারবেন না”।

এইবছর মেলায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও খুব জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সুপার শ্যাম সিং জানান, “মেলার নিরাপত্তার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মেলা চত্বরে থাকছে, সাদা ড্রেসের পুলিশ, সিসিটিভি, ওয়াচ টাওয়ার। পাশাপাশি মেলাতে কয়েকটি কন্ট্রোল রুমও খোলা হয়েছে। সন্দেহভাজন কিছু দেখলেই তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আখড়া গুলিতেও পুলিশ নজরদারি থাকছে। যাতে কোনো ব্যক্তি বাইরে থেকে এসে আখড়ায় আশ্রয় নিয়ে মেলায় যাতে কোনোরকম অশান্তি না ঘটাতে পারে সেইদিকেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি নজরদারির আওতায় থাকছে স্নানের ঘাট গুলি। এককথায় বলতে গেলে বলা যায় মেলায় অশান্তি এড়াতে নিরাপত্তা চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে মেলা চত্বর”।

কেন্দুলির জয়দেবের মেলা সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র মেলা, যেখানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের এক বিচিত্র সমাবেশ ঘটে। বিশেষত সমাজের বিদ্বজ্জনের উপস্থিতি এখানে লক্ষ করার মতো। জেলার তো বটেই, এমনকী রাজ্যের অন্যান্য অংশের সঙ্গে কলকাতার সাহিত্যিক, গবেষক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, লোকশিল্প-বিশারদ, শিল্পী, সমালোচকদের নিত্য আনাগোনা এ মেলায়। ভিনদেশি মানুষের আসা-যাওয়াও প্রায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী।এ মেলার আর এক বিশেষত্ব অন্নসত্রগুলিতে। মন্দির চত্বর ছাড়িয়ে স্নানঘাটের রাস্তার দু-ধার বরাবর কৃপাপ্রার্থী নিরন্ন অসহায় মানুষের ঢেউ এসে মেশে শীতের শীর্ণ অজয়ের বালুচরে। সবের সঙ্গেই মেলায় থাকেন ব্যবসায়ীরা। পাথরের বাসন, লোহার সামগ্রীর সঙ্গে এ মেলায় সব চেয়ে বেশি বিক্রি হয় কলা। এ ছাড়া তো রয়েছেই নাগরদোলা, সার্কাস, পুতুলনাচ। সরকারি ভাবে মেলা ৩ দিনের হলেও মেলা চলে প্রায় ১৫ দিন।
আন্তর্জাতিক আঙিনায় পৌঁছেলও এ মেলা আসলে গ্রামীণ মেলা। তাই মিলবে না কোনও হোটেল, লজ বা অতিথিশালা। ভরসা কেবল গৃহস্থদের ঘরভাড়া নেওয়া ও বাউলদের আখড়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here