আজ নারী দিবসেও পিঙ্কির দিন কাটবে টোটো চালিয়েই # নির্মলকুমার সাহা

0
26

আজ নারী দিবসেও পিঙ্কির
দিন কাটবে টোটো চালিয়েই

নির্মলকুমার সাহা

কখনও টোটোয় বসে, আবার কখনও টোটোয় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এক মহিলা ঠায় তাকিয়ে মাঠের দিকে।

যেখানে আরও অনেকের সঙ্গে অ্যাথলেটিক্স চর্চায় মেতে তাঁর বছর দশেক বয়সী মেয়ে।

উত্তর ২৪ পরগনার বানীপুরে এই ছবিটা এখন প্রায় সবার কাছেই পরিচিত।

মা পিঙ্কি দত্ত, মেয়ে মৌলি দত্ত।

পিঙ্কি একসময় অ্যাথলেটিক্স করতেন। স্বপ্ন দেখতেন বড় অ্যাথলিট হবেন।

সেই স্বপ্নপূরণ হয়নি। নানা কারণে পিঙ্কি পারেননি জেলার সীমানা টপকাতেই।

স্বপ্ন অধরা থাকার জ্বালাটা এখনও রয়েছে। তাই মেয়ে মৌলিকে নিয়ে এসেছেন অ্যাথলেটিক্সে।

নিজে যা পারেননি, চান মেয়ে তা করে দেখাক।

দক্ষিণ হাবড়ার বাসিন্দা পিঙ্কি টোটো চালক। ২০১৬ থেকে টোটো চালাচ্ছেন।

টোটোর রুট হাবড়া স্টেশন থেকে কৈ পুকুর। ভোরে বাড়ি থেকে টোটো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। দুপুরে ফিরে বাড়ির কাজ। বিকেলে আবার টোটো নিয়ে রুটে চলে যাওয়া। ফিরতে ফিরতে রাত।

সপ্তাহে তিনদিন ওই রুটিনের কিছুটা ব্যতিক্রম। সেটা মেয়ের অ্যাথলেটিক্সের জন্যই। সকাল বা বিকেল যখন অনুশীলন থাকে, সেই বেলায় টোটো নিয়ে রুটে যাওয়া হয় না।

মেয়েকে টোটোয় চাপিয়ে নিয়ে যান বানীপুরের মাঠে। ওখানে কাশীপুর অ্যাথলেটিক ট্রেনিং সেন্টারের একটি শাখা আছে। সেখানে ট্রেনিং করান সুখেন মণ্ডল। তাঁর কাছেই হাবড়া গার্লস হাই স্কুলের ক্লাস ফাইভের ছাত্রী মৌলি অ্যাথলেটিক্স অনুশীলন করে। ওই তিন দিনও অবশ্য বাকি একবেলা টোটো নিয়ে রুটে যান।

পিঙ্কির স্বামী মৃত্যুঞ্জয় দত্ত হাবড়া পৌরসভার কর্মী। টানাটানির সংসারের জন্যই কি টোটো চালানো শুরু?

‌ পিঙ্কি বললেন, ‘‌আর্থিক সমস্যা একটা কারণ অবশ্যই। এর বাইরে রয়েছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যাপারটাও। আর মেয়ের জন্মের পর থেকেই ঠিক করে ফেলেছিলাম ওকে খেলাধুলো শেখাব। জানতাম এখন খেলাধুলোর জন্যও অনেক খরচ। আগে লিফট অপারেটারের কাজ করতাম। মেয়ের লেখাপড়া, খেলাধুলো সবদিকে আমাকেই নজর রাখতে হয়। নির্দিষ্ট সময় মেনে ওই কাজ করতে সমস্যা হচ্ছিল।

তাই ওই কাজটা ছেড়ে বিকল্প কিছুর চেষ্টা করছিলাম।

আমার এক বন্ধুর স্বামী টোটো চালায়। একসময় আমার মনে হল, টোটো চালাতে তো পারি।

বন্ধুর স্বামীই আমাকে টোটো চালানো শেখান। উৎসাহ দেন। আরও একজনের কাছ থেকে উৎসাহ পেয়েছি। তিনি তপন সেনগুপ্ত। তখন হাবড়া পৌরসভার কাউন্সিলার ছিলেন। বছর দুয়েক আগে মারা গেছেন। শুধু উৎসাহ দেওয়া নয়, উনি লাইসেন্স বের করে রুটও ঠিক করে দিয়েছিলেন।’‌

পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টোটো চালাতে গিয়ে কোনও সমস্যায় পড়তে হয়েছে?‌

পিঙ্কি বললেন, ‘‌এখানে যাঁরা টোটো চালান তাঁদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছি। তবে প্রথম দিকে সাধারণ লোকজনের কিছু কটূক্তিও শুনতে হয়েছে। খারাপ মন্তব্য করত। পুরুষরাই এসব বেশি করত। মহিলারা খুব উৎসাহ দিত। এখন ওরকম কটূক্তি অবশ্য শুনতে হয় না। সবাই আমার টোটো চালানোটা মেনে নিয়েছে।’‌

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস।

এই বিশেষ দিনেও পিঙ্কি দত্তর সূচিতে কোনও পরিবর্তন নেই।

প্রতিদিনের মতো আজও তিনি বের হবেন টোটো নিয়ে। এটাই তাঁর জীবন। যে জীবনটা তিনি উপভোগ করতে শুরু করেছেন পাঁচ বছর আগে থেকেই।

পিঙ্কি বলছিলেন, ‘‌শুরুতে একটু জড়তা তো থাকেই। আমারও ছিল। এখন আর নেই। এখন টোটো চালানোটা বেশ উপভোগই করছি।’‌

এরপর পিঙ্কির সংযোজন, ‘‌না করে অবশ্য উপায়ও নেই।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here