বেঙ্গল ওয়াচ # সাহিত্যের পাতা # তৃতীয় সংখ্যা # প্রকাশিত # ২০ সেপ্টেম্বর # স্মৃতিগল্প # দুখ-জাগানিয়া মুখগুলো # বদরুদ্দোজা শেখু

0
20
স্মৃতিগল্প
দুখ-জাগানিয়া মুখগুলো
বদরুদ্দোজা শেখু
ইমরুলের বাড়ি এঁদো গণ্ডগ্রামে।
সে প্রায় পঞ্চাশ ষাট বছর আগেকার কথা। তখন সে সাত আট বছরের ছেলে।
তাদের বাড়িটা ছিল গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে।মাটির বাড়ি। অর্ধেক খড়ে ছাওয়া, অর্ধেক পুরনো টিনের।
প্রতি বছর বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে কালবৈশাখীর কবলে চালের খড় উড়ে যেতো। বাড়ই লাগিয়ে সেই চালবাতা মেরামত করে আবার নতুন করে ছাইতে হতো।
বাড়ই ওর বাপের সব সময়ের সাঙাৎ সুচন্দর কাকা, মেসের চাচা, বিনয় নানা।
ছোট থেকে সে তাদেরকে ওই নামেই ডাকতে শিখেছে। সুচন্দর কাকার বড় ছেলে বিশু। বিশুর  মা ছোটখাটো গড়নের গোলগাল রমণী। শ্যামলা রং, কপালে বড় গোল লাল সিঁদুরের টিপ পরত, সিঁথিতে সিঁদুর। কখনও কখনও তাদের বাড়িতে আসত। লালতে শাক, সকালের তালের রস বা গাছপাকা আম দিতে। ওদের বাড়িতে একটা পুরনো আমের গাছ ছিল। কাকিমা দেখা হলেই ইমরুলকে বড় নাতি বলে ডাকত।
মায়ের সাথে গল্পগাছা করে যেত।
বিনয় নানার একটাই ছেলে কাশীনাথ।
আলকাপের পালাগান করত। হঠাৎ অনেক দিন গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যেত।
ওর বাপ বলত, বখাটে বাউন্ডুলে ছেলে,
শুধু বাপ-মা’র রোজগারে খায় আর রাজা উজীর মেরে বেড়ায়। কাশীর মা মাঝে মাঝে ইমরুলের মায়ের ডাকে ওদের বাড়িতে ভোর রাতে মুড়ি ভাজতে আসত। কখনূ উঠান দাওয়া চাতাল নিকিয়ে দিয়ে যেত।
মহরমের হালুয়া রুটি করতেও সাহায্য করত। মা বিনয়-নানীকে  কিছু টাকাপয়সা ,চাল আর মুড়ির ভাজার ভাগ দিতো। গাছের আম হলে সবাইকে দিত।
মেসের চাচার বাড়িটা ছিল ইমরুলদের বাড়ি পূর্বদিকে পাঁচ-ছ’ঘর পরেই। ওরাও মাকে নবান্ন ঈদ মহরমে নানান কাজে সাহায্য করত।
ইমরুলদের বাড়ির পাশেই গদার বাড়ি
এককালে ছিল কোনও এক বনেদী গদাধর বেনের  বাড়ি। বিশাল এলাকা।
এখন সব ভেঙেচুরে বুনো পোড়ো জঙ্গল।
এখন গদার বাড়ির মালিক সোলেমান মণ্ডল। গদার বাড়ির পর থেকেই হিন্দু পাড়া। তখনও বারো-চৌদ্দ হিন্দুঘর ছিল ও পাড়ায়। পাড়াটাকে পাঁচুদের পাড়া বলে ডাকা হত। পাঁচু নাকি ডাকাত ছিল। শোনা কথা।
ইমরুলের বাপ সুচন্দর কাকা মেসের চাচা বিনয় নানা এরা সবাই এক গোত্রীয় মানুষ, শ্রমজীবী।সবাই বনেদী দশা থেকে ক্রমশ কমবেশি ক্ষয়িষ্ণু পরিবার। খেটেখুটে এসে সাঁঝের পরে ইমরুলদের বাহির বাড়ির দাওয়ায় খেজুর পাতার মাদুর বিছিয়ে বসত ওদের আসর। কখনও বিড়ি কখনও কল্কিগাঁজা এ সব সামগ্রী কেউ না কেউ নিয়ে আসতই। ওরা সুখটান দিত আর নিজেদের সুখদুঃখের নানান পুরনো অধ্যায় হাতড়াত।  চড়কের মেলা, গাজনের মেলা, কালিতলার মেলা, কবিগানের আসর, আলকাপের গান, শবেবরাৎ ঈদ সিমাই হালুয়া রুটি, ধান রোওয়া -কাটা, কারও বিয়েশাদির ঘটনা, পারিবারিক বিষয়, আর – -আরও কত কী। প্রাত্যহিকী ব্যাপার। বচসা বিবাদও হত, তবে পরের দিনই আবার এক। কত রাত পর্যন্ত আসর চলত সে জানে না। ধীরে ধীরে সেই সব অভাবী পরিবারগুলো
সোলেমানের কাছে ভিটেমাটি বিক্রি করে পাশের গ্রামের ডাঙাডহর খাস জমি ইত্যাদিতে উঠে যায়। সেই দুঃখ ইমরুলের বাপ ভুলতে পারেনি।
সে বড় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। তখন সম্প্রীতি ছিল। মানুষের পালাপার্বনে মিলমিশ ছিল। আন্তরিকতা ছিল।এখন দলাদলি আর গ্রাম্য রাজনীতির রঙের মারপ্যাঁচ।
সেই সব মানুষগুলো আজও বড় দুখ-জাগানিয়া মুখ হয়ে জেগে থাকে ইমরুলের মনে।
 ———-

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here