বেঙ্গল ওয়াচ # সাহিত্যের পাতা # তৃতীয় সংখ্যা # প্রকাশিত # ২০ সেপ্টেম্বর # বিশেষ নিবন্ধ # চরণচিহ্ন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই # রঞ্জনা রায় 

0
71

বিশেষ নিবন্ধ।।।।।।।।।।

।।।চরণচিহ্ন ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই।।।

রঞ্জনা রায়।।।।।

বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা

ধোয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা

তোমার যাত্রা অসীমের লীলা পথে

নতুন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে

দেশ-বিদেশের প্রণাম আনিল টানি

সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।

 

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের প্রতি পরম শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বর্তমান যুগে ধর্মীয় বিভাজনকারী সমাজব্যবস্থার গ্লানি থেকে মুক্ত হবার জন্য শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের জীবন ও বাণী এক অমোঘ ঔষধি স্বরূপ।

আজ আবার এসেছি আমার প্রিয় উত্তর কলকাতার কিছু গল্প নিয়ে। উত্তর কলকাতায় আমার এই অনুবর্তনের কেন্দ্রে আছেন যুগাবতার পরম পুরুষ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব।

বিগত সপ্তাহে আমরা গিয়েছিলাম পরম পুণ্যস্থান ‘শ্যামপুকুর বাটি’তে। আজ সেই বাড়িতে প্রণাম জানিয়ে আমি যাবো অতি নিকটের আর একটি বাড়িতে।

যে বাড়িতে শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব সুস্থ অবস্থায় তাঁর কলকাতা ভ্রমণকালে বেশ কয়েকবার এসেছিলেন। যেটি তৎকালীন কলকাতাস্থ তাঁর বিশেষ কয়েকটি আড্ডাঘরের মধ্যে একটি ছিল।

আমার জন্ম উত্তর কলকাতায় হলেও আমার পিতৃ বংশের প্রধান আবাসস্থল ছিল মেদিনীপুর জেলা। আমার বাবা স্বর্গীয় জগত কুমার পাল ছিলেন দাঁতন থানার অন্তর্গত তুরকা গড় ও কোতাই  এস্টেটের জমিদার বংশের সন্তান।

পিতামহ স্বর্গীয় চৌধুরী অপর্ণা কিংকর পাল ছিলেন মেদিনীপুর জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। প্রপিতামহ স্বর্গীয় রাধাগোবিন্দ পাল ও ছিলেন সেই ইংরেজ আমলে মেদিনীপুর জেলার  অনারারি  ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট।

উনি কবি ছিলেন ‘কুরু কলঙ্ক’ ও ‘সমুদ্র মন্থন’ নামে দুটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগে আমার দাদু অপর্ণা  কিংকর পাল যখন কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ এ পড়তে এলেন তখন বৃন্দাবন বোস লেন এর বাড়ি কেনা হয়েছিল।

শিবের গীত গাইতে বসে ধান ভানছি তার জন্য মার্জনা চেয়ে নিলাম। ফিরে যাই সেই পরমপুরুষ যুগাবতার এর চরণচিহ্নে সেই – শ্যামপুকুরে।

শ্যামপুকুর স্ট্রিট ধরে বিধান সরণির ট্রাম রাস্তার দিকে এগিয়ে যাবার পথেই বাঁদিকে পড়ে  সমাজপতি লাইব্রেরী।

এটি শতাব্দী প্রাচীন গ্রন্থাগার। আর তার ঠিক উল্টো দিকেই শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের পদরেণু মাখা পূণ্যভূমি নেপালের দেওয়ান বিশ্বনাথ উপাধ্যায়ের বাড়ি।

বিশ্বনাথ উপাধ্যায় নেপালের রাজার উকিল রাজপ্রতিনিধি। নেপাল নিবাসী হলেও কলকাতায় ওঁর বাড়ি ছিল। অতি আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ ও পরম ভক্ত ছিলেন।

শ্রী শ্রী ঠাকুর তাকে কাপ্তেন বলে সম্বোধন করতেন।তিনি হঠযোগ জানতেন। অনেকসময় শ্রী শ্রী ঠাকুরের সমাধিকালে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে  নিম্নে এই জগতে ফিরিয়ে আনতেন।

শ্রীম কথিত কথামৃতের চতুর্থ ভাগের বিংশ  খন্ডের প্রথম পরিচ্ছেদে শ্রীশ্রী ঠাকুর বলছেন – “শ্রীরামকৃষ্ণ‌ (মহেন্দ্রাদি ভক্তদের প্রতি) –  কলকাতায়  কাপ্তেনের বাড়িতে গিছ্লাম। ফিরে আসতে অনেক রাত হয়েছিল।

“কাপ্তেন এর কি স্বভাব ! কি ভক্তি! ছোট কাপড় খানি পরে আরতি করে।  একবার তিন বাতিওলা প্রদীপে আরতি করে, তারপর আবার এক বাতিওলা প্রদীপে। আবার কর্পূরের  আরতি।

“সে সময় কথা হয় না। আমায় ইসারা করে আসনে বসতে বল্লে।

“পূজা করার সময় চোখের ভাব – ঠিক যেন বোলতা কামড়েছে !

“এদিকে গান গাইতে পারে না। কিন্তু সুন্দর স্তব পাঠ করে।

“তার মার কাছে নীচে বসে। মা – আসনের উপর বসবে।

বা”বা ইংরেজের হাওয়ালদার। যুদ্ধক্ষেত্রে এক হাতে বন্দুক আর একহাতে শিব পূজা করে। খানসামা শিব গড়ে গড়ে দিচ্ছে। শিব পূজা না করে জল খাবে না। ছয় হাজার টাকা মাহিনা বছরে।

“মাকে কাশীতে মাঝে মাঝে পাঠায়। সেখানে বার তেরো জন মার সেবায় থাকে। অনেক খরচা।বেদান্ত গীতা ভাগবত – কাপ্তেনের কণ্ঠস্থ।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেব কাপ্তেনের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া করেছেন। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃতে তার বর্ণনা পাই- “পাঠার চচ্চড়ি করে, কাপ্তেন বলে পনর দিন থাকে, – কিন্তু তার পরিবার বল্লে – ‘নাহি নাহি  সাত রোজ’। কিন্তু বেশ লাগলো। ব্যঞ্জন সব একটু একটু। আমি বেশি খাই, বলে আজকাল আমায় বেশী দেয়।

“তারপর খাবার পর হয় কাপ্তেন নয় তার পরিবার বাতাস করবে।

কাপ্তেন দক্ষিণেশ্বরে শ্রী শ্রী ঠাকুরের কাছে ১৮৭৫ – ৭৬ সাল নাগাদ এসেছিলেন। শ্রী শ্রী ঠাকুরের কথায়-” কাপ্তেন ও যেদিন আমায় প্রথম দেখলে সেদিন রাত্রে রয়ে গেল” ( শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত)।

শ্যামপুকুর স্ট্রিটের ওপর বিরাট দুই মহলা বাড়ি। সামনের দিকে কাপ্তেনের বংশধররা থাকতেন। আর পিছনের দিকে বাড়ির কিছু অংশ এবং বাগান অনুষ্ঠান বাড়ির জন্য ভাড়া দেওয়া হতো। বাগানে ছিল সুন্দর সুন্দর মার্বেল পাথরের পরীর মূর্তি।

আমাদের আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের বিয়ে ও জন্মদিনের নানা অনুষ্ঠানে ওখানে গিয়েছি। আমার ছেলের পাঁচ বছরের জন্মদিন পালনের জন্যও ওই বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সেটাই ওই বাড়িতে শেষ যাওয়া। তারপর ওই বাড়ির আমূল পরিবর্তন হয়েছে।

বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। ঐতিহ্য যথাযথ ভাবে রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের চরণ স্পর্শে ধন্য যে বাড়ি সেই বাড়ির একটি অংশ এখন ‘বাগিচা’ নামে একটি মোগলাই রেস্টুরেন্ট এবং পেছনের সেই বাগান ও বাড়ির  বাকি অংশ ফ্ল্যাট হয়ে যায়।

কাপ্তেন ছিলেন একজন আচারনিষ্ঠ হিন্দু পুরুষ।  শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের কাছে দক্ষিণেশ্বরের যারা আসতেন যেমন ব্রাহ্ম কেশবচন্দ্র সেন, শিবনাথ শাস্ত্রী আবার ছোকরা ভক্তদের মধ্যে নরেন্দ্রনাথ দত্ত রাখার বাবুরাম শরৎ শশী আরো অনেকে ছিলেন। এরা কেউই গোঁড়া হিন্দু ছিলেন না আর ঠাকুরের সংস্পর্শে এসে এরা ধর্মের সংস্কারমুক্ত  এক নতুন দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। আচারনিষ্ঠ কাপ্তেন এদের বিশেষ পছন্দ করতেন না। তিনি শ্রী শ্রী ঠাকুরকে এদের সঙ্গে মিশতে বারণ করতেন।

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃতে শ্রীশ্রী ঠাকুর বলছেন -“লোকটা ভারী আচারী। আমি কেশব সেনের কাছে যেতুম তাই একমাস এখানে আসে নাই। বলে, কেশব সেন ভ্রষ্টাচার – ইংরেজের সঙ্গে খায় ভিন্ন জাতে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে, জাত নাই।

আমি বললুম  আমার সে সবের দরকার কি? কেশব হরিনাম করে দেখতে যাই, ঈশ্বরীয় কথা শুনতে যাই আমি কুলটি খাই, কাঁটায় আমার কি কাজ?  তবুও আমায় ছাড়ে না; বলে তুমি কেশব সেনের ওখানে কেন যাও? তখন আমি বললুম একটু বিরক্ত হয়ে, আমি তো টাকার জন্য যাই না – আমি হরিনাম শুনতে যাই আর তুমি লাট সাহেবের বাড়িতে যাও কেমন করে? তারা ম্লেচ্ছ তাদের সঙ্গে থাকো কেমন করে? এইসব বলার পর একটু থামে।

শ্রীরামকৃষ্ণ- কাপ্তেনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল… ছোকরাদের নিন্দা আরম্ভ করলে! বলে – ওরা ইংরাজি পড়ে  যা তা খায়, ওরা তোমার কাছে সর্বদা যায়, – সে ভাল নয়। ওতে তোমার খারাপ হতে পারে।

তখন বললাম, লোকে হাজার জপ তপ করুক যদি বিষয়বুদ্ধি থাকে তাহলে কিছুই হবে না; আর শুকর মাংস খেয়ে যদি ঈশ্বরে মন থাকে সে ব্যক্তি ধন্য তার ঈশ্বরলাভ হবেই।”

পাণ্ডিত্য শ্রীরামকৃষ্ণদেবের পছন্দ নয় বিদ্যারও অহংকার হয় ।নিরহংকার নিরভিমানী ব্যক্তিই ঈশ্বরলাভ এর উপযুক্ত তাই বলছেন – “আমি কাপ্তেনকে বকতে লাগলাম বললাম তুমি পড়েই সব খারাপ করেছ। আর পড়ো না।”

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের প্রকৃত স্বরূপ হয়তো কাপ্তেন কিছুটা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের কথায় “আমার অবস্থা কাপ্তেন বললে উড্ডীয়মান ভাব। জীবাত্মা ও পরমাত্মা; জীবাত্মা যেন একটা পাখী আর পরমাত্মা যেন আকাশ – চিদাকাশ।  কাপ্তেন বললে ‘তোমার জীবাত্মা চিদাকাশে  উড়ে যায়, – তাই সমাধি;’ (সহাস্যে) । কাপটেন বাঙ্গালীদের নিন্দা করলে। বললে বাঙ্গালীরা নির্বোধ কাছে মানিক রয়েছে চিনলে না।” ( শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত)

পরম ভক্ত শ্রী বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ও ঠাকুর  শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মধুর সম্পর্কটি   শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত থেকে সংগৃহীত কিছু ঘটনার মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরলাম।  আশা রাখি সবার ভালো লাগবে।

মনে মনে ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে এগিয়ে চললাম আরো একজন ভক্ত সাধকের বাড়ির অভিমুখে।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের চরণ স্পর্শে ধন্য উত্তর কলকাতা এক নব আধ্যাত্বিকতার কাশীক্ষেত্র।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here