আনিস আহমেদ # আমার এই লেখাটি আজকের সাপ্তাহিক বাঙালিতে প্রকাশিত হয়েছে # পাঠকদের পড়ার সুবিধার জন্য লেখাটি এখানে আবার পোস্ট করলাম # খোদা হাফেজ থেকে আল্লাহ হাফেজ : এক বিস্ময়কর বিবর্তন

0
25

আমার এই লেখাটি আজকের সাপ্তাহিক বাঙালিতে প্রকাশিত হয়েছে। পাঠকদের পড়ার সুবিধার জন্য লেখাটি এখানে আবার পোস্ট করলাম।

খোদা হাফেজ থেকে আল্লাহ হাফেজ: এক বিস্ময়কর বিবর্তন

আনিস আহমেদ

এই বিবর্তনকে বিস্ময়কর বলছি এ জন্যে যে আমাদের ছোট বেলায় কিংবা আমাদের বাবা মায়ের ছোট বেলাতে আল্লাহ হাফেজ এই বিদায় সম্ভাষণটি আদৌ প্রচলিত ছিল না।

আমরা বরাবর অভ্যস্ত ছিলাম খোদা হাফেজ বলায় । আল্লাহতে খোদাতে আমরা কোন পার্থক্য বুঝতাম না।

ভাষাগত পার্থক্য ছাড়া আদৌ কোন পার্থক্য আছে বলে আমার মনে হয় না।

তবু আজকাল একটু অবাক হই যখন দেখি কাউকে খোদা হাফেজ বললে তিনি যেন খানিকটা ভুরু কুঁচকে তাকান, দেশে গেলে আমি কাউকে খোদা হাফেজ বললে মনে করেন বিদেশে থেকে এই বয়সেও আমি ধর্ম-কর্ম ভুলে গিয়ে নিশ্চিত উচ্ছন্নে গেছি।

বয়স্ক লোকেরা যাঁরা আমারই মতো, এক সময়ে খোদা হাফেজ বলতেন তাঁরাও এখন নির্বিঘ্নেই আল্লাহ হাফেজ বলছেন।

এক ধরণের কল্পিত বিশুদ্ধবাদী চিন্তা থেকে এই পরিবর্তনের সূচনা।

আমরা সকলেই জানি যে হাফেজ(প্রকারন্তরে হাফিজ) শব্দটি মূলত আরবী তবে ফারসি ভাষায়ও এর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে ।

হাফেজ শব্দটির দুটি অর্থ রয়েছে একটি হিফজ অর্থাত্ মুখস্থ করা এই শব্দ থেকে এসেছে।

আর তাই পবিত্র কোরান যাঁর মুখস্থ তাঁকে আমরা হাফেজ কিংবা সুনির্দিষ্ট ভাবে কোরানে হাফেজ বলে থাকি।

হাফেজ শব্দটির আরেকটি মানে হচ্ছে হেফাজতকারী অর্থাত্ সুরক্ষক ।

তাই আমরা যখন কাউকে খোদা হাফেজ বলে বিদায় জানাই তখন আমরা এই প্রার্থনাই করি যে খোদা যেন হেফাজত করুন বা সুরক্ষক হন।

আল্লাহ হাফেজের মানেটাও একই, আল্লাহ হন সুরক্ষক ।

তবে ঐতিহ্যগত ভাবেই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ খোদা হাফেজ ব্যবহার করে এসেছেন।

খোদা শব্দটি ফারসি শব্দ, আল্লাহ সন্দেহাতীত ভাবেই আরবী শব্দ এবং প্রায় অসংখ্যবার এই শব্দটি পবিত্র কোরানে রয়েছে।

উভয়ের অর্থই স্রষ্টা ।

তা হ’লে কেবল কি ভাষিক বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য খোদা পরিত্যক্ত হচ্ছেন আল্লাহর কাছে।

অনেকেই ভাবতে পারেন যে আরব বিশ্বের, বিশেষত সৌদি আরবের প্রভাবে এই পরিবর্তন এসেছে।

হ্যাঁ , সত্যবটে আরব বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের প্রবাসী মানুষ কেবল যে স্বদেশের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল বাড়াচ্ছেন তাই নয়, নিজেদের অজান্তেই আরব্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছেন ।

তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।

তবে বলাই বাহুল্য আল্লাহ হাফিজ এই সম্ভাষণটি সৌদি আরবে কিংবা আরব বিশ্বে তেমন একটা ব্যবহার করা হয় না।

তারা বরঞ্চ ফি-আমানিল্লাহ অর্থাত্ সহজ বাংলায় যাকে বলা হয় আল্লাহ মালিক কিংবা আল্লাহ আপনার সহায় হোন, এ রকম কথাই বলে থাকেন ।

আল্লাহ হাফিজ এই বিদায় সম্ভাষণটি চালু করেছিলেন আশির দশকে পাকিস্তানের সামরিক জেনারেল জিয়াউল হক।

আফগানিস্তানে সোভিয়েট বাহিনীর বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ‘ মুজাহিদরা যে জিহাদের পরিবেশ তৈরি করেছিল, সেই সময়ে কথিত বিশুদ্ধবাদ প্রচলনের রাজনৈতিক ইচ্ছায় প্রণোদিত এই শব্দগুচ্ছ আল্লাহ হাফেজ।

বিশেষত সৌদি আরবকে খুশি করার জন্য পাকিস্তানি জিয়া ফারসি শব্দ খোদা পরিহার করেন।

তিনি পাকিস্তানের লায়ালপুর শহরের নামও ফায়সালাবাদে পরিণত করে তদানীন্তন সৌদি বাদশাহ ফায়সালের প্রশংসা অর্জন করেন ।

১৯৭৯ সালে সোভিয়েত সেনার আফগানিস্তানে প্রবেশ এবং ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির ক্ষমতা দখলের মুখে জেনারেল জিয়া সুন্নি প্রধান পাকিস্তানকে আরো বেশি কট্টর করে তোলার প্রয়াস নেন।

সুনির্দিষ্ট ভাবে ১৯৮৬ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনের একজন উপস্থাপিকা প্রথম এই শব্দটি মিডিয়ায় ব্যবহার করেন ।

যদিও সম্প্রতি পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় চলতি বছর ১৬ই মার্চ সংখ্যায় রউফ পারেখ নামের একজন লেখক দাবি করেছেন এখন থেকে ১৮০ বছর আগেকার উর্দু অভিধানে খোদা হাফেজ শব্দটি রয়েছে , তিনি এই বিদায়ী শুভ কামনাসূচক শব্দের ব্যাপক প্রচলনের কোন দৃষ্টান্ত দেননি ।

আসলে এর ব্যাপক প্রচলন ঘটে পাকিস্তান থেকে তবে ফারসি শব্দ খোদা বাদ পড়ায় আরব বিশ্ব সম্ভবত খুশিই হয়।

আল্লাহ শব্দটি পবিত্র কোরানে অসংখ্যবার ব্যবহার করা হয়েছে এই ধ্রুব সত্যের পাশাপাশি এ কথাও সত্যি যে স্রষ্টা অর্থে শব্দটির প্রচলন প্রাক ইসলামি যুগেও ছিল।

মনে করা হয় শব্দটির উত্পত্তি আল ইলাহ শব্দ থেকে যার মানে হচ্ছে স্রষ্টা।

ভাষাতাত্বিক দিক দিয়ে এটি এল -এলাহ শব্দের সঙ্গেও সম্পর্কিত যা হিব্রু ভাষায় স্রষ্টারই আরেক নাম।

আল্লাহ শব্দটি আরব বিশ্বে মুসলমান ছাড়াও খ্রীষ্টান , ইহুদি এবং এমনকী মালায়েশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে খ্রীষ্টান ও শিখরাও ব্যবহার করেন।

তবে আল্লাহ যেহেতু কোরান শরীফে স্রষ্টা বোঝাতে সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ সেহেতু মুসলমানদের কাছে আল্লাহ সর্বাধিক প্রিয় নাম ।

এখানে বলা প্রয়োজন যে পবিত্র কোরানে আল্লাহর আরও ৯৯ টি বিশেষণমূলক নাম আছে।

খোদা শব্দটিও মুসলমানরা স্রষ্টা (আল্লাহ) অর্থেই শ্রদ্ধার সঙ্গে ব্যবহার করে আসছেন।

খোদা শব্দটির উত্পত্তি খোয়া- দা অর্থাত্ স্বসৃষ্ট অর্থে প্রাচীন জরাথ্রুষ্ট ধর্মে প্রচলিত ছিল।

এই প্রাচীন খোয়া শব্দটি সংস্কৃত স্ব শব্দেরই রূপ যে জন্য খোদা স্বসৃষ্ট ।

খোদার এই সংজ্ঞা আল্লাহর সংজ্ঞারই সমার্থক অর্থাত্ তাঁর কোন স্রষ্টা নেই । উর্দু ভাষায়ও খোদা মানে , “ খুদ আয়া” অর্থাত্ যে নিজেই এসেছে।

ফারসি এই খোদা শব্দটি নিঃসংশয়ে আল্লাহ অর্থে দীর্ঘকাল ধরে ইরান ছাড়াও ভারতীয় উপমহদেশের মুসলমানরা ব্যবহার করে আসছেন এবং দুটি শব্দেরই একটি প্রাক-ইসলামিক ব্যুত্পত্তিগত ইতিহাস রয়েছে।

তা হ’লে খোদাকে নিয়ে আপত্তিটা কোথায় ?

ফারসি শব্দ বলে ?

পবিত্র কোরান যদি পারস্য দেশে অবতীর্ণ হতো তা হলে তার ভাষা হতো ফারসি, আর সকলেই বিনা দ্বিধায় খোদা শব্দটি ব্যবহার করতেন।

বাংলাদেশে যদি এই গ্রন্থ আসতো তা হ’লে মুসলমানরা আল্লাহর পরিবর্তে ঈশ্বর কিংবা ভগবান বলতেন ।

মূলত যিনি স্রষ্টা ,তাঁকে যে নামেই, যে ভাষায় ডাকা হোক না কেন, তাতে ধর্মের অবমাননা হয় না।

ধর্ম কোন ঠুনকো বিষয় নয়, আল্লাহতো ননই।

যেমনটি এর আগে অন্য একটি লেখায় লিখেছিলাম নবীজি তাঁর বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন , ‘ আরবরা অনারবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয় , সাদারা কালোদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়’, তাঁর এই উক্তিই তো প্রমাণ রাখে যে আল্লাহকে কোন একটি অঞ্চলে বা কোন একটি ভাষায় আবদ্ধ রাখার প্রয়াস ইসলামের মূল মন্ত্রের বিরোধী।

জরুরি বিষয়টি হচ্ছে এই যে ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ধর্মের কোন সংঘাত নেই।

ঊলু দেয়া থেকে শুরু করে প্রাক-ইসলামিক অনেক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখনও আরব দেশে পালন করা হয়।

মুসলমানরা পয়লা বৈশাখ উদযাপন করলে আর মুসলমান থাকবেনা, পাকিস্তানের এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে ভাগ্যিস আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম, নইলে বাংলা নববর্ষ সকল বাঙালির উত্সবে পরিগণিত হতো না।

বাংলাদেশে এবং গোটা ভারতে ইসলাম এসেছে মূলত মধ্যএশিয়া ও পারস্যের পথ ধরে ।

সেখানে মানব প্রেম, সুফিবাদ তথা ভক্তিবাদ প্রধান ।

পীর -ফকিররা এ উপমহাদেশে প্রেমের বাণী দিয়ে ধর্ম প্রচার করেছেন।

শক্তি নয়, ভক্তিটাই প্রধান। যান্ত্রিক ধর্মাচার নয়, আত্মিক নিবেদনটাই সেখানে সব চেয়ে মূখ্য বিষয়।

উগ্রবাদিদের কথিত বিশুদ্ধতা নয়, প্রকৃত বিশুদ্ধি আল্লাহতে খোদাতে বিভক্তিতে নয়, একাত্মতায় ধর্মের বাণী অর্থবহ হয়।

ব্যক্তিগত ভাবে আল্লাহ হাফেজ এবং খোদা হাফেজ কোনটাতেই আমার কোন আপত্তি নেই।

আমার আপত্তি সেই মনোভাবের বিরুদ্ধে যে মনোভাব খোদা হাফেজকে অনৈসলামিক বলে চিহ্নিত করে, দীর্ঘদিনের লালিত অনুভূতিতে কঠোর কুঠারাঘাত করে, ভক্তির পরিবর্তে শক্তির জোরে জয়লাভ করতে চায় ।

ধর্মের ভেতরে যে সব সময় একটি বিমূর্ত বিষয় থাকে, সেটি অনুধবান করতে আচার সর্বস্ব লোকেরা ব্যর্থ হন।

পাদটীকা: ওহ এখন মনে পড়লো, পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত কিন্তু ফারসিতে লেখা, সেখানে খোদা শব্দটিও রয়েছে। আর পাকিস্তান যে কবি ইকবালকে তাদের স্বপ্ন দ্রষ্টা বলে দাবি করে তাঁর বাপ-দাদারা কিন্তু কাশ্মিরী ব্রাহ্মণ ছিলেন ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here