অণুগল্প # অভিষেক সাহা # সুতপা ব‍্যানার্জি রায় # অভিজিৎ সিনহা

0
26

অণুগল্প

কৃতজ্ঞ

অভিষেক সাহা

 

“চপ্পলটা খুলে ছুড়ে মার, টিপ করে।” চিৎকার করে বলল শম্ভুদা।
হিমেল সেই মতো বাঁ পা থেকে চপ্পলটা খুলে ছুড়ে মারল। টিপ করেছিল কি না ওই জানে, তবে লাগল না।
“সত্যি, বলিহারি তোর টিপ! জীবনে কোনও দিন ক্রিকেট-ফুটবল খেলিসনি? নিদেনপক্ষে ডাংগুলি বা কাচের গুলি? যদি খেলে থাকিস তবে তো লজ্জা আরও বাড়ল।” বিরক্ত হয়ে বলল শম্ভুদা।
“কী হয়েছে শম্ভুদা, তুমি এত রাগ করছ কেন? এটা তো খুবই সামান্য ব্যাপার। একবারে হয়নি, সুযোগ তো পাবই, নেক্সট টাইম ঠিক হয়ে যাবে।” হিমেল আশ্বস্ত করল।
“হবে না, আর একবার কেন, দশ বার সুযোগ পেলেও হবে না। আমি তো দেখলাম, ছোড়ার সময় তোর ইচ্ছাটাই নেই। আরে, যে কোনও কাজ, তা সে বড়ই হোক বা ছোট, সবার আগে যে করছে তার ইচ্ছে থাকাটা দরকার, ভীষণ ভাবে দরকার। আমি তো খেয়াল করলাম। তোর সেটাই নেই। কী ব্যাপার বল তো? অন্য কোনও গল্প আছে নাকি?” শম্ভুদা জানতে চাইল।
“কী যে সব তুমি বল না, ভাল্লাগে না। একটা সামান্য ঘটনাকে তুমি বড় করছ। দাঁড়াও এর পর থেকে আমার তাল খাওয়ার ইচ্ছা হলে বাজার থেকে কিছু তিল এনে তোমার হাতে দিয়ে দেব, ব্যস, তোমার ছোঁয়ায় ওগুলো তাল হয়ে যাবে।” প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করল হিমেল।
“দেখ হিমেল, আমার মাথার চুল, গালের দাড়ি কিন্তু রং লাগিয়ে সাদা হয়নি। আমি তোর চোখে কেমন যেন বেশ করুণা ভাব দেখতে পেয়েছি ওই আরশোলাটাকে চপ্পল ছুড়ে মারার সময়। আমার দিব্যি তুই সত্যি কথা বল।” শম্ভুদা সত্যি জানতে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করল। সফলও হল।
জিভ কাটল হিমেল, নিচু স্বরে বলল,”তুমি ঠিকই বলেছ শম্ভুদা, আমি আরশোলাটাকে আঘাত করতে চাইনি। তবে করুণায় নয়, কৃতজ্ঞতায়। আমার ভয়ঙ্করী বউটা এই একটা প্রজাতিকেই শুধু ভয় পায় তো, তাই।”

————

অণুগল্প

পাত্রী পছন্দ

সুতপা ব‍্যানার্জি রায়

শ্রাবণী এ বছর এমএসসি পাশ করে নেট পরীক্ষার
প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওর বাবা এই ব‍্যাপারটা বুঝলেও মায়ের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার বিশাল তাড়া। আত্মীয়পরিজনের মধ্যে ঘটকও জুটে যায়, বিশেষ করে মেয়ে যদি রূপে গুণে শ্রেষ্ঠ হয়।
এ রকম ভাবেই শ্রাবণীদের বাড়িতে এল এক পাত্রপক্ষ। বাবা-মা আর একমাত্র ছেলে নিয়ে পরিবার। প্রাথমিক আলাপ পর্ব আর জলযোগ সারার পর ওই পরিবারের কর্তার উঠে পড়ার বিশেষ তাড়া দেখা গেল না। কথায় কথায় জানা গেল শ্রাবণীরা বাঙাল আর পাত্র অনির্বাণরা ঘটি।
শ্রাবণী আতঙ্কিত হল যে, এ বার বাঙাল-ঘটি, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, ইলিশ-চিংড়ি এ সব প্রসঙ্গ এল বলে। কারণ শ্রাবণীর বাবাও কবেকার ছেড়ে আসা পুব-বাংলার ভিটেমাটি, লোকাচার এ সব নিয়ে খুব পজেসিভ।
কিন্তু বিপদটা ও দিক দিয়ে এল না, এল অন‍্য দিক দিয়ে। সামনে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে অনির্বাণের বাবা ভূপতিবাবু শুরু করলেন— “চারপাশে যা ঘটছে তা মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে এই কেন্দ্রীয় সরকারকে পালটানো দরকার। এ সব আর চলে না। চেয়ারে থাকব, সুবিধে ভোগ করব আর রাজনৈতিক দায়িত্ব, রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করব না, এ সব আর চলে না।”
শ্রাবণী মনে মনে প্রমাদ গোনে। শ্রাবণীর বাবা প্রীতিমোহনবাবু প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো শুরু করলেন— “এখানে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে কেন্দ্র কী করবে? ওটা তো রাজ‍্য সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।” বলে পুরো পরিসংখানের ঝাঁপি উপুড় করে ফেললেন।
ধুন্ধুমার বেঁধে যাওয়া এই গণ্ডগোলকে শ্রাবণী আর অনির্বাণ বহু চেষ্টা করেও থামাতে পারল না। উত্তরোত্তর মুখে থুথু ছিটিয়ে আর গায়ের ঘাম ঝরিয়েও যখন কোনও ফয়সালা হল না, তখন ভূপতিবাবু অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে— “খোকা চলে আয়, এ বাড়িতে এক গ্লাস জলও আর খাব না।”
প্রীতিমোহনবাবু— “হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ, এতক্ষণ সবই খেলেন তো, যান যান… আপনার বাড়িতে আমার মেয়েকে আমি বিয়ে দিয়ে পাঠাবও না।” এই গোলমালের ফাঁকে অনির্বাণ শেষ চেষ্টা করল— “কিন্তু বাবা, শ্রাবণীকে আমার পছন্দ হয়েছে।”
ভুপতিবাবু টান দিয়ে ছেলেকে দরজার বাইরে নিয়ে ধমক দিলেন— “হোক পছন্দ।”

————

অণুগল্প

আলো আঁধারি

অভিজিৎ সিনহা

নজর এড়াল না বিশালের। বলে উঠল, “এ জন্যই বলে রানির দেশের মেয়ে।”
বিশালের মন্তব্য কমপ্লিমেন্ট হিসেবেই নিল উপমা। সত্যই তো, যে যে-দেশে বড় হয়ে উঠবে… কে না জানে, ব্রিটিশ এটিকেটই বিশ্বসেরা। পানের জন্য যে একটা অ্যাম্বিয়েন্সের প্রয়োজন হয়… জোরালো টিউবের আলোয় যে সেটির আনন্দ পুরো… থাক, অনেক কিছুই বোঝে না কলকাতার বাঙালিরা। বুঝতেও চায়ও না।
মৃদু আলোয় ঘরটা এখন মায়াবী। বিশাল তাকাল শঙ্খের দিকে। ওর চোখটা ঢুলুঢুলু। নেশা জমেছে মনে হচ্ছে। নিজের বসার জায়গায় উপমা। খানিকটা তরল ঢালে গ্লাসে। জল মিশিয়ে নেয়।
— কী, একটা সিগারেট নিবি?
— দে।
— ধরিয়ে দেব, না নিজেই?
— কেন, আমি কি কচি খোকা? বিরক্তি মাখিয়ে বলেই বৌল থেকে কিছুটা চানাচুর নেয় শঙ্খ। তার পর বিশালকে বলে, অত সহজে কেৎরে পড়লে কোম্পানি চালানো যায় না, জানিস?
ব্যবসা বিশালেরও। রুপোর বাসনকোসনের। পারিবারিক। প্রতিষ্ঠা বিশালের মায়ের বাবা জগদীশপ্রসাদের হাতে।
হয়তো সেটা আঁচ করেই ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে উঠল শঙ্খ, “সবটাই একা হাতে। বুঝেছ নদেরচাঁদ?”
উপমা বলে উঠল, “জন্তু।”
“সিএ ফার্ম আবার কোম্পানি, তেলাপোকা আবার পাখি। তোদের তো ইনভেন্টরিই নেই” মন্তব্য বিশালের।
পানের আসরে এ রকম বিতণ্ডা একেবারেই না-পসন্দ উপমার। কথা ঘোরাবার জন্য সে বলে উঠল, “জানেন বিশালদা, লিভারপুলে আমার যে বোন থাকে, আজ তার মেল…”
— জেরিনা টেরির কথা বলছেন তো? কী লিখেছে সে? কী করছে?
— কী যে বাজে কথা বলেন না! ওর নাম জেসমিন। কত বার বলেছি। ওর আর আমার মা পিঠোপিঠি বোন। জানেন, জেসমিন এখন সিঙ্গল মাদার। ওর স্বামী ইয়ান ওকে ছেড়ে দিয়েছে। অবশ্য ইয়ানেরও এখন চাকরি নেই। সরকারি ভাতাই সম্বল। লকডাউনে কী যে হল–
— আমাদের ব্যবসারও তো। কত কাস্টমার যে কমে গেছে! কিছু স্টাফ ছাঁটাই করতে হয়েছে। আরও কিছু হয়তো… তবে সব চেয়ে ভাল আছেন ইনি। ফার্ম ধরা। তাদের পিএল, ব্যালেন্স শিট।
শঙ্খ একটু মুচকি হাসল। উত্তর দিল না। লিভারপুলের কথায় তার হয়তো মনে পড়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের দিনগুলোর কথা। উপমার সঙ্গে তার সময় কাটানোর কথা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here