শ্যামাপ্রসাদের গানে বাবীর সুর, মাতাচ্ছে চামেলীর বিহা-

0
66

সুমন দে, হাওড়া : ১৯৫১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম। হাওড়ার মাকড়দহ গ্রামের চ্যাটার্জি পাড়ার এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা তাঁর। ছোটবেলা থেকেই লোকগানের প্রতি ঝোঁক ছিল শ্যামাপ্রসাদের। গান শেখার জন্য সোজা হাজির হয়েছিলেন কলকাতার পূর্ণদাস বাউলের কাছে। সেই শুরু। করেছেন অনেক অনুষ্ঠান।

শ্যামাপ্রসাদ গাইতেন মূলত পল্লীগীতি ও ভক্তিগীতি। একইসঙ্গে বাউল গানেও তাঁর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। সংসার চালাতে মাঝে মাঝে দিনে ৩০-৪০ কিলোমিটার সাইকেল চালাতে হতো তাঁকে। কৃষি দপ্তরের চাকরিতে যোগ দেন ১৯৭৫ সালে। সংসারের কাজ ও চাকরির পরে যেটুকু সময় পেতেন সেই সময় সঙ্গীত চর্চা করতেন শ্যামাপ্রসাদ। এলাকায় ‘কাকা’ বলে জনপ্রিয় এই শিল্পীর গানের একটি দলও তৈরি করেছিলেন। সেই দলের প্রায় সবাই ছিল মাকড়দহের। শুধু পরিচিত গান গাওয়াই নয়, নিজে অনেক গান লিখেছেন তিনি। সুরও দিয়েছিলেন। তাঁর গানে উঠে এসেছে সমাজের নানা বৈষম্য ও দুর্নীতির কথা। কলকাতার একটি রেকর্ডিং কোম্পানিতে অডিশন দিয়ে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই শেষ মুহূর্তে সেই রেকডিং কোম্পানি জানায়, গান গাইতে গেলে ডোনেশন দিতে হবে। সেই কথা শুনে গান না গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। পরে তাঁর লেখা একটি গানে তিনি বলেন, ‘টাকা টাকা টাকা ভাই/ টাকার মত জিনিস নাই/ পাগল মন তুই ভবে আইস্যা টাকাই চিনলি না।’
শ্যামাপ্রসাদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা ছিল। হারমোনিয়াম, খমক, দোতারা ও একতারা সমান দক্ষতায় বাজাতে পারতেন তিনি। প্রয়োজনে ঢোল, তবলা ও বাঁশিও বাজাতেন। তবে সুযোগ ও সময়ের অভাবে তিনি নিজের এলাকার বাইরে সেই ভাবে পরিচিতি পাননি। গানের বিষয়ে কিছুটা রক্ষণশীলও ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। কোনো অনুষ্ঠানে ডাক এলে আগে জেনে নিতেন সেখানে তার আগে-পরে কারা গাইবে। সেই শিডিউলে কোনো চটুল গানের স্লট থাকলে সেই অনুষ্ঠানে যেতেন না তিনি। নিজের ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি বলতেন, “একজন শিল্পীর কাছে সব থেকে বড় হল তার সম্মান। সস্তা প্রচারের লোভে নিজের সম্মান নষ্ট করতে পারব না। বর্তমান সময়ে পল্লীগীতি ও লোকগান নিয়ে অনেক নতুন কাজ হচ্ছে। সেগুলো জনপ্রিয়ও হচ্ছে। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ যে সময়ে এই ঘরানার গান নিয়ে চর্চা করেছিলেন সেই সময় এই গানের শ্রোতা ছিল অনেক কম। এর জন্য বিভিন্ন সময়ে অনেক কটাক্ষ সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে। পরিচিতদের কেউ কেউ বলতেন, ‘পল্লীগীতি এখন আর চলে না। অন্য গান গা।” কিন্তু কাউর কথাতেই নিজের গানের ধরণ বদলাননি এই সংসারি বাউল।

সরকারি চাকরি ২০১১ সালে অবসর নেন তিনি। তারপরে পুরোদস্তুর গান নিয়েই থাকতেন। ২০১৩ সালে অসুস্থ হন। ধরা পড়ে ফুসফুসের সমস্যা। মারা যান ২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ব্যক্তি জীবনে অগোছালো ও উদাস স্বভাবের মানুষ ছিলেন পূর্ণদাস বাউলের এই ছাত্র। তাই নিজের লেখা গানের খাতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রেখে দিতেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, তাঁর মৃত্যুর পরে উপযুক্ত সংরক্ষনের অভাবে তাঁর ব্যবহৃত কিছু যন্ত্র ও গানের খাতা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তার মধ্যে থেকেই দু-তিনটি গানের খাতা ভাল অবস্থায় উদ্ধার করা গিয়েছে। সেখানে শ্যামাপ্রসাদের লেখা বেশ কিছু গান রয়েছে। তবে সেগুলোর সুর করা নেই।
বর্তমানে মাকড়দহ গ্রামেরই যুবক বাংলা ব্যান্ড তেপান্তরের বাবি (অভিষেক)। সেই গানগুলোকেই নতুন করে তৈরি করার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। বাবি কলেজ জীবন থেকেই লোকগান নিয়ে কাজ করেছেন। বাবীর গানের দল ‘তেপান্তর’ এখন শুধু বাংলা বা ভারতেই নয় ভারতের বাইরেও বেশ পরিচিত এবং জনপ্রিয় নাম। সম্প্রতি তেপান্তর বাংলাদেশে রীতিমতো সাড়া ফেলেছে।
বাবি এদিন জানান, ইতিমধ্যে ৪টি গান তৈরী করে ফেলেছেন |
“ধীরে ধীরে চল সজনী”
“একটা ফচকে বেড়াল”
“টাকার মতো জিনিষ নাই”
“চামেলী তোর নাকি বিহা”
বাবি জানান, কয়েক মাসের মধ্যেই গান গুলির কাজ সম্পন্ন হলেই সেগুলি নিয়ে মিউজিক এলবামের করার চিন্তা ভাবনা করছেন শ্যামাপ্রসাদ চ্যাটার্জী স্মৃতি মঞ্চের ভক্ত ও সদস্যরা । বাবি এই সম্মান পেয়ে স্বভাবতই খুব খুশি ।
ইতিমধ্যেই বাবির সুরে শ্যামাবাবুর রেখে যাওয়া কথায় “চামেলী তোর নাকি বিহা” গানটি বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে ।।
গানগুলি ‘মডার্ন ফোকে’র আদলে তৈরী করছেন তেপান্তরের বাবী |
তিনি বলেন, “শ্যামাপ্রসাদবাবু গানগুলি সৃষ্টি করেছেন বেশ কয়েক দশক আগে। সে সময়ে দাঁড়িয়ে এই গানগুলো যথেষ্ঠ আধুনিক ছিল। মাঝে মিউজিকে অনেক বদল এসেছে। তাই গানগুলোর মূল গড়নকে এক রেখে কিছু পরিমার্জন করা হয়েছে।”
পুরোনো গানগুলিকেই বর্তমান প্রজন্ম এর কাছে জনপ্রিয় করে তোলাই বাবীর লক্ষ্য।
ঘটনাচক্রে বাবির বাবা দেবনাথ ব্যানার্জী আবার শ্যামাপ্রসাদের সহপাঠী ছিলেন। বাবীর কথায়, “আমি বাবার মুখে শ্যামাকাকুর লড়াই সম্পর্কে কিছু কথা জেনেছি। শ্যামাকাকুর পরিবার আমায় তাঁর লেখা কিছু গান গাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। বেঁচে থাকাকালীন যে মানুষটা নিজের প্রাপ্য সম্মান পাননি, তাঁকে সেটা দিতে পারলেই আমার পরিশ্রম স্বার্থক।” তাঁর কথায়, “বলতে পারেন এটা অগ্রজকে অনুজের শ্রদ্ধাঞ্জলী।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here