‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’র ডাক দিয়ে প্রথমে ঝড় তুলেছিল কমিউনিস্টরাই # ফেসবুকে লিখেছেন সাবেক সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ রফিক আনোয়ার

0
72

‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’র ডাক দিয়ে প্রথমে ঝড় তুলেছিল কমিউনিস্টরাই

### রফিক আনোয়ার

ফুরফুরার ‘বড় হুজুর’ তথা আব্দুল হাই পীর সাহেবের ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে ঘাটাঘাটি করার সময় দেখলাম তিনি তাঁর এক ভাষণে কমিউনিস্টদের প্রচণ্ড সমালোচনা করেছেন।

এই সমালোচলা ছিল কমিউনিস্টদের নাস্তিক্যবাদী ধারণাকেই ঘিরে।

ওই সমালোচনার জের ধরে আমি কমিউনিস্টদের ইতিহাস-ভূগোল জানতে লেগে পড়ি।

তখনই জানতে পারি ভারতে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠায় খেলাফত আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সেটা কিভাবে, আর ঠিক কোথায় খেলাফতিদের ভূমিকা – প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাথায় উঁকি মারে ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়াতে বার বার উঠে আসা আরেকটা প্রশ্নও: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে কমিউনিস্টদের সেরকম উল্লেখযোগ্য কোনও ভূমিকা চোখে পড়ে না কেন?

বা, ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে কমিউনিস্টদের দেখতে পাওয়া যায় না কেন?

ওই দুটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার খোঁজে বহু চাপা পড়া তথ্য জানতে পারলাম. সেগুলিকে নিয়েই আজকের এই প্রতিবেদন।

কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলায় খেলাফতিদের অবদান জানতে হলে ১৯২০ দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের সংগ্রামের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে খতিয়ে দেখা একান্ত প্রয়োজন।

খেলাফতিদের প্রত্যক্ষ মদত ও উদ্যোগেই তাসখন্দে প্রথম ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিত পড়ে।

পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলাগুলোর (1922 – 1927) বিষয়বস্তুর দিকে নজর ফেললেই তা পরিষ্কার হয়ে যায়।

জানা যায়, ১৯২২’তে ব্রিটিশ সরকার ৪০ থেকে ৫০ জন মুহাজিরের বিরুদ্ধে পাঁচ ধাপে পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলার সূচনা করে।

চলে ১৯২৭ পর্যন্ত. মুহাজিরদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল, তারা ১৯২০ সালে তাসখন্দে সিপিআই বা Communist Party of India গড়ে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে নেমেছিল. তাসখন্দ তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ।

এবং ওই নেতারা সেখানে রাজনৈতিক আর সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন. মস্কোতে. The Communist University of the Toilers of the East -তে. ওই সব মুহাজির ছিলেন মুখ্যত খেলাফতি. তাঁরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তুরস্কে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন. এই প্রস্তুতি পর্বের মাঝেই তাসখন্দে তাঁদের সাক্ষাত হয় এম এন রায়ের সঙ্গে. এম এন রায়ের কথায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর উদ্যোগে সামিল হন. এবং তাসখন্দে ভারতের প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির ভিত্তি রাখেন. তাদের বিরুদ্ধে 121-এ ধারায় অভিযোগ আনে ভারতের তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার. অভিযোগে বলা হয়, ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে নামতে আম জনতাকে উস্কানি দিচ্ছিলেন ওই মুহাজিররা. অভিযোগনামায় আরও বলা হয়, মুহাজিররা রাশিয়ায় ট্রেনিং নিয়ে ভারতে ঢোকেন. তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারত জুড়ে কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলা. আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করা.

উল্লেখ্য, রুশ বিপ্লবের পরে যে সব বিশিষ্ট ভারতীয় নেতা লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার নয়া সরকারের ভূয়সী প্রশংসা করেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিপিন চন্দ্র পাল আর বাল গঙ্গাধর তিলক. অন্যদিকে, বিপ্লবের কথা শুনেই তড়িঘড়ি মস্কো রওনা হন আবদুল সাত্তার খয়েরি আর আবদুল জব্বার খয়েরি. মস্কোয় তাঁরা লেনিনের সঙ্গে দেখা করেন, শুভেচ্ছাও জানান. রুশ বিপ্লবের প্রভাবে উত্তর আমেরিকায় Ghadar Party গড়ে ওঠে. অভিবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের মাথাতেও রুশ বিপ্লবের অনুকরণে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা আসে. ওই সময় খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বহু ভারতীয় মুসলমান দেশ ছাড়েন. তুরস্কে খিলাফত আন্দোলনে সরাসরি যোগ দিতে চেয়ে. তাদের বেশিরভাগ সোভিয়েতের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি জমান. সেখানে তাঁরা পাকাপাকি কমিউনিস্ট বনে যান. এই সফরকারী মুসলিম মুহাজিরদের সঙ্গে কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বীও যোগ দেন. ভারতে বলশেভিক বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতির ঢেউ ক্রমেই জোরদার হতে দেখে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে ব্রিটিশ কতৃপক্ষ. তা আটকাতে উঠেপড়ে লাগে. পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তারা প্রাথমিকভাবে নিষেধাজ্ঞার ফতোয়া জারি করে দেয়. ওই ফতোয়াতে কমিউনিজম থেকে দূরে সরে থাকতে বিশেষ করে মুসলিমদের আহ্বান জানানো হয়. বাড়তে থাকা কমিউনিজমের উপর নজরদারি চালাতে স্বরাষ্ট্র বিভাগ একটি বিশেষ শাখাও খুলে বসে. ওই শাখার কাজ ছিল ভারতে আমদানি মার্কসবাদী সাহিত্যের উপর নজরদারি চালানো. কমিউনিস্ট বইপত্র ঠিকভাবে যাচাই করে দেখার কড়া নির্দেশ জারি হয়. অন্যদিকে, কমিউনিজম বিরোধী প্রচার চালাতে প্রচুর বইপত্রও বাজারে আসতে থাকে.

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ভারতে শিল্পোদ্যোগ দ্রুত বাড়তে থাকে. ফলে শ্রমজীবির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এর বিকাশও ঘটতে থাকে. একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পণ্যের দর-দামও বাড়তে থাকে. ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন জোরদার হতে থাকে. ভারতজুড়ে নগরাঞ্চলে গড়ে ওঠে ইউনিয়ন. সঙ্গে ধর্মঘটের প্রথাও চালু হয়. ১৯২০ তে সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়. ১৯২১ তে মুম্বই-তে এস. ডাঙ্গে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন. শীর্ষক দেওয়া হয় ‘গান্ধী বনাম লেনিন’. পুস্তিকায় গান্ধী আর লেনিনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির তুলনামূলক বিচার করা হয়. দেখানো হয়, গান্ধীর চেয়ে লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গি বেশি কার্যকর. স্থানীয় মিল-মালিক Ranchoddas Bhavan Lotvala-র প্রত্যক্ষ মদতে মার্কসবাদী সাহিত্যের একটি গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হয়. সেখান থেকে মার্কসবাদী ধ্রুপদী রচনাগুলির অনুবাদ প্রকাশ করা শুরু হয়. ১৯২২ সালে Lotvala -র সহায়তায় ডাঙ্গে প্রথম মার্কসবাদী ইংরেজি সাপ্তাহিক জার্নাল ‘Socialist’ চালু করেন.

এবার আসা যাক দ্বিতীয় প্রশ্নে- ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঠিক কোথায় অবস্থান ছিল কমিউনিস্টদের? গত ১৫ আগস্ট ‘newsclick’ অনলাইন মিডিয়াতে এই প্রসঙ্গে এক ঐতিহাসিক তথ্যবহুল নিবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে. লেখক ডক্টর হর্ষবর্ধন. দিল্লির জওহরলাল নেহেরু ইউনিভার্সিটি’র ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ সোশ্যাল সিস্টেম’ বিভাগ থেকে পিএইচডি করেছেন. নিবন্ধের সহলেখক প্রবাল সরণ আগারওয়াল একই ইউনিভার্সিটিতে ‘হিস্টোরিক্যাল স্টাডিস’ বিভাগে পি এইচ ডি করছেন. নিবন্ধের শীর্ষক – Where were Communists during India’s Freedom Struggle? (ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে কমিউনিস্টরা কোথায় ছিল?).

যাই হোক, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কিত মূল বয়ান বা আখ্যানটি হ’ল, মহাত্মা গান্ধী আর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসই মুখ্যত ব্রিটিশদের ভারত থেকে খেদিয়ে দিয়েছিলেন. ইদানিং এর সঙ্গে আরও একটি বা বয়ান জুড়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে. সেখানে বলা হচ্ছে, আরএসএস আর সংঘ পরিবারেরও স্বাধীনতা সংগ্রামে এক জোরাল ভূমিকা ছিল. খুব জোরদার প্রচার চললেও ইতিহাসে এই বয়ানের কোনও ভিত্তি পাওয়া যায় না. ইতিহাস বরং এর উল্টোটাই বলে. স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষিত মহলের কাছে এই বয়ান ব্রাত্যই থেকেছে. আপামর ভারতবাসীও আজ বুঝে গেছে যে, গান্ধী-নেহেরু আর কংগ্রেসকে হেয় করতে, তাঁদের গৌরবময় ভূমিকাকে কালিমালিপ্ত করতেই এই বয়ান বাজারে ছাড়া হয়েছে. ইংরেজরা যে ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়, তার পেছনে গান্ধী-নেহেরু আর কংগ্রেসের ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর ঐতিহাসিক. এব্যাপারে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই. তবে ইংরেজ-খেদাওয়ে তাদেরই একমাত্র ভূমিকা ছিল, তা মানা যায় না. দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবশ্যই আরও কিছু বিশেষ গোষ্ঠীরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল. আর এই গোষ্ঠীগুলির অন্যতম ছিল কমিউনিস্টরা. অন্তত ইতিহাস সেটাই বলে.

যাই হোক, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে আরও বেশ কয়েকটি আখ্যানের কথা জনতার স্মৃতিতে ধরা আছে; যেমন, সুভাষচন্দ্র বসু আর তাঁর আইএনএ সম্পর্কে; রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহ আর বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কালে গণ-উত্থান সম্পর্কে; ইত্যাদি. সব মিলিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ভারতবর্ষ শাসন করা ব্রিটিশদের পক্ষে ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছিল. তাদের অবস্থা ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র মতো হয়ে উঠেছিল. যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যেতে চাইছিলো. তারা হাড়ে হাড়ে টেরও পেয়েছিলো, ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া তাদের কাছে অন্য কোনও বিকল্প ছিল না.

এই রকম সব আখ্যানের মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া সহ অন্যান্য বাম মনোভাবী গোষ্ঠীগুলির অবদান হারিয়ে যেতে বসেছে. দলীয় নথি ঘাটলে অবশ্য স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা সামনে আসে. স্পষ্ট হয়ে ওঠে. বিভিন্ন জার্নাল আর বইপত্রেও কমিউনিস্টদের অবদান স্বীকার করা হয়েছে. জোরালভাবেই. কিন্তু, লোকমুখে তা নিয়ে আর আলোচনা শোনা যায় না বললেই চলে. বিষয়টি যেন জনসাধারণের স্মৃতি থেকে মুছেই গেছে.

কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৪২’এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নেয়নি- এই অভিযোগ বার বার-ই তোলা হয়েছে. আর সেখানেই কমিউনিস্টদের আরএসএস আর হিন্দু মহাসভার সঙ্গে এক সারিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে. উল্লেখ্য, আরএসএস আর হিন্দু মহাসভা যে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেয়নি তা ঐতিহাসিক সত্য. কমিউনিস্টরাও এই আন্দোলন এড়িয়ে গিয়েছিলো সেটাও সত্য. কিন্তু কেন? তা নিয়ে কথা বলা হয় না. অংশ না নেওয়ার কারণগুলি কী ছিল? তখন কমিউনিস্টদের সামনে বাস্তব পরিস্থিতিটাই বা কেমন ছিল? পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত. ওই পরিস্থিতিটিকে ভালোভাবে বুঝতে হবে. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের অনেক আগে থেকেই কমিউনিস্টরা ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’র দাবি তুলেছিল. তারা অবস্থান নিয়েছিল, ইংরেজদের ভারত ছাড়তেই হবে. এই অবস্থান বা দাবির প্রেক্ষিতেই কমিউনিস্টদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সামিল হওয়া বা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত না হওয়ার বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করতে হবে. এবং এই প্রসঙ্গ টেনেই হিন্দু মহাসভা ও আরএসএসের সঙ্গে কমিউনিস্টদের তুলনা করতে হবে.

এর জন্য ১৯২০’র দশকে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টদের পর্যায়ক্রমে সংগ্রামের খুঁটিনাটি জানতে হবে. তবেই সত্য বেরিয়ে আসবে. ওই খুঁটি-নাটি জানতে গিয়ে শুরুতেই নজরে আসে
পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২২-১৯২৭) প্রসঙ্গ. আগেই এই মামলা নিয়ে আলোচনা করেছি. এখানে শুধুমাত্র একটা কথাই বলতে চাই যে, উপনিবেশিক শাসনতন্ত্র কে উপড়ে ফেলে স্বাধীন ভারত গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই কমিউনিস্ট পার্টি আত্মপ্রকাশ করেছিল তদানীন্তন সোভিয়েত দেশের তাসখন্দে. আর এতে খেলাফতিদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল. তাই ব্রিটিশ সরকার ৪০ থেকে ৫০ জন মুহাজিরের বিরুদ্ধে পাঁচটি ধাপে এই মামলা ঠুকেছিলো. ওই মুজাহিররা প্রথমে রাশিয়াতে প্রশিক্ষণ নিয়ে তুরস্কে খেলাফত রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হতে চেয়েছিলেন. কিন্তু এম. এন রায়ের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা জানিয়ে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেন. আর ব্রিটিশ নাগপাশ থেকে মুক্ত ভারত গড়ার পণ নেন. তাসখন্দের মাটিতে ভিত পড়ে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সি পি আই) -র. পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ শাসকরা মুহাজিরদের বিরুদ্ধে যে ১২১-এ ধারায় অভিযোগ আনে সেখানেও বলা হয়, ‘জনসাধারণের জন্য স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিপ্লবে নেমেছিলেন’ ওই মুহাজিররা.

এরপর ১৯২৪-২৫’তে কানপুর কমিউনিস্ট (বলশেভিক) ষড়যন্ত্র মামলা ঠোকা হয়. কমিউনিস্ট নেতাদের বিরুদ্ধে. ওই নেতাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন তাসখন্দ গ্রুপের সদস্য. অন্যরা ছিলেন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উঠে আসা কৃষক ও শ্রমিক কর্মী-নেতা. যেমন শওকত উসমানী, মুজফ্ফর আহমেদ, এস এ ডাঙ্গে, এম এন রায়, সিঙ্গারাভেলু চেট্টিয়ার, গোলাম হুসেন প্রমুখ. ব্রিটিশ সরকার এখানেও একই অভিযোগ আনে. বলা হয়, এই সব কমিউনিস্ট নেতা ‘হিংসাশ্রয়ী বিপ্লব ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে চায়. তাদের এই হিংসাত্মক কার্যকলাপ ব্রিটিশ ভারতের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করেছে. এই কাজ রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল’. এখানেও ১২১-এ ধারা মোতাবেক মামলা ঠোকা হয়.

ফের ১৯২৯-এ কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা ঠুকে ব্রিটিশ সরকার. মামলা চলে ১৯৩৩ পর্যন্ত. ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষিতে মামলাটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ. এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলাকালেই কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির দল হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় সিপিআই. এই মামলায় ভারত জুড়ে বেশ কয়েকজন ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়. পাকড়াও করা হয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে যুক্ত তিন ইংরেজকেও. ধৃত নেতাদের বিরুদ্ধে ধর্মঘটে মদত দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়. বলা হয়, তাঁদের মদতেই রেল আর টেক্সটাইল শিল্পের শ্রমিকরা ধর্মঘটে নামে. ধৃত নেতাদের মধ্যে ছিলেন শওকত উসমানী, এসএ ডাঙ্গে, মুজফফর আহমেদ, সোহান সিং জোশ, পিসি যোশি আর ফিলিপ স্প্রাট প্রমুখ. তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ হয় ১২১-এ ধারা. মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার বিচার চলা কালেই দেশে দেখা দেয় মহামন্দা. একদিকে ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের ধরপাকড় আর অন্যদিকে মহামন্দার প্রকোপ – এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশ জুড়ে শুরু হয়ে যায় ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকাণ্ড, সংগঠন আর ধর্মঘট.

ইতিহাস বলে, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে কমিউনিস্টরাই প্রথমে পূর্ণ স্বরাজ বা ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’র দাবি তুলেছিল. ১৯২১’তে কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনকালে সর্বপ্রথম ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’র দাবি জানান বামপন্থীরা. ওই অধিবেশনে কমিউনিস্ট নেতাদের স্বাক্ষরিত একটি ইশতেহার বিতরণ করা হয়েছিল. প্রস্তাবটি ছিল মওলানা হাসরাত মোহানী স্বাক্ষরিত. প্রস্তাবনা সহ ওই ইশতেহারে সমস্ত কমিউনিস্ট নেতারই স্বাক্ষর ছিল. সেখানে দাবি ছিল দেশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার. উল্লেখ্য, ১৯২৫ সালে ভারতে সিপিআই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায়. শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল দেশের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা. ফলস্বরূপ, শুরুতেই সিপিআই- এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়. তবে ওই নিষেধাজ্ঞা তাদের কার্যকলাপের উপর পূর্ণচ্ছেদ বসাতে পারেনি. তারা কাজ করতে থাকে The Workers and Peasants Party-র মাধ্যমে.

১৯২৭’তে বোম্বাই তথা বর্তমানের মুম্বই-এ দলীয় নেতাদের বৈঠকে কমিউনিস্ট পার্টির এক নতুন সংবিধান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়. নতুন সংবিধানে ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, সার্বজনীন ভোটাধিকার, জমিদারিবাদ বিলোপ, সর্বজনীন উপযোগিতামূলক বিষয়গুলির (public utilities) জাতীয়করণ’ সহ আরও কয়েকটি শর্ত সামিল করা হয়. ১৯৩১’এ যখন মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা চলছিল, তখন সিপিআই উপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য এক খসড়া কর্মসূচি ঘোষণা করে গণ-বিপ্লবের ডাক দেয়. জনতার উদ্দেশে. তাদের কর্মসূচির মধ্যে ছিল: ক) ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে সহিংস আন্দোলন; সমস্ত ঋণ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন; সমস্ত ব্রিটিশ কারখানা, ব্যাংক, রেলপথ, সমুদ্র ও নদী পরিবহন, আর আবাদকারীর বাজেয়াপ্তকরণ ও জাতীয়করণ: খ) ৮ ঘন্টার কর্ম দিবস প্রতিষ্ঠা, শ্রমজীবিদের অবস্থার আমূল উন্নতি, রাষ্ট্রের উদ্যোগে বেকারদের রক্ষণাবেক্ষণ, মজুরি বৃদ্ধি, নারী, যুবক ও পুরুষদের জন্য সমান কাজের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের জন্য সমান বেতন চালু: গ) বিশেষ পদ, বর্ণ, জাতীয় ও সাম্প্রদায়িক সুযোগ-সুবিধাগুলির বিলোপসাধন, লিঙ্গ-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত নাগরিককে সমানাধিকার ও সমমর্যাদা দান.

এই কর্মসূচি রূপায়ণে কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক, কৃষক, মহিলা, ছাত্র, শিল্পী ও লেখকদের নিয়ে বহু গণসংগঠন গড়ে তোলে. ১৯২০ দশকের শেষের দিকে বোম্বাই টেক্সটাইল স্ট্রাইকের মতো বেশ কয়েকটি ধর্মঘটেরও আয়োজন করে. ১৯৩০এর গোড়ার দিকে বেশ কয়েকজন কমিউনিস্ট নেতা Indian National Congress বা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস-এ যোগ দিতে থাকেন. তাঁদের কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রামকে আরও জোরদার ও তৎপর করে তোলা.

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিস্টরাই সর্বপ্রথম যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে. বোম্বাই (এখন মুম্বই), কলকাতা, কানপুর, মাদ্রাজ, ধনবাদ, অসমের ডিগবয় সহ আরও কয়েকটি শহরে একাধিক শিল্প ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেয়. এই যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভগুলি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে. কয়েক লক্ষ শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষকে ওই বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়.

সুভাষ চন্দ্র বসু যুদ্ধবিরোধী এই বিক্ষোভের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে জার্মান আগ্রাসনের পরে সিপিআই তার অবস্থান বদল করে. এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির সঙ্গে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়. ওই সিদ্ধান্তের ফলেই তারা শেষ পর্যন্ত Quit India বা ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নেয়নি. যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে, সিপিআই আবারও সারাদেশে কৃষক ও শ্রমিকদের সংগঠিত করে আন্দোলনে নামে. অবিলম্বে সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি নিয়ে.

খ্যাতনামা ঐতিহাসিক শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, ‘ভারতে শিল্প ধর্মঘট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয় ১৯৪৬’তে যখন ১২ কোটিরও বেশি মানব-দিবস খোয়া যায়. আর এই সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় তিনগুণ বেশি. শুধু শিল্পসংস্থাগুলিরই নয়, পোস্ট ও টেলিগ্রাফ বিভাগ সহ দক্ষিণ ভারতীয় রেল আর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল রেল-এর শ্রমিক-কর্মীরাও ধর্মঘটে যোগ দেয়.’ এই গণ-বিক্ষোভ ব্রিটিশদের মনোবল ভেঙে দিতে থাকে. তাদের উপলব্ধি জাগে, ভারতের উপর তারা ক্রমেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে. আর বেশিদিন এখানে কর্তৃত্ব রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়.

এই প্রসঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের পাল্টা বিবরণটি হলো: ১৯৪৬’এর জানুয়ারিতে বোম্বাই (মুম্বই) রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির ধর্মঘট পালিত হয়. আর এর ঠিক পরের মাসে এক বিদ্রোহ দেখা দেয়. বিদ্রোহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য নৌ ঘাঁটি আর সমুদ্রে নোঙর ফেলা জাহাজগুলিতে. এই বিদ্রোহের প্রতি সহানুভূতির টানে Royal Air Force আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানরাও প্রতীকী ধর্মঘটে সামিল হয়. এই বিক্ষোভ চূড়ান্তে পৌঁছয় যখন কমপক্ষে ৭৮ টি জাহাজের কর্মী, ২০ হাজারেরও বেশি তালিকাভুক্ত নৌসেনা আর ২০ টি উপকূলবর্তী বাহিনী বিদ্রোহে সামিল হয়. এছাড়া, বোম্বাই-এর আপামর সাধারণ কর্মজীবী আর শ্রমজীবী মানুষেরও স্বতস্ফূর্ত সমর্থন ছিল এই বিদ্রোহে. ধর্মঘটীদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে তারাও কাজ করা বন্ধ করে দেয়. পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে. পুরোপুরি এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়. বোম্বাইয়ের শ্রমিক শ্রেণি শুরু করে শিল্প ধর্মঘট. আম জনতা রাস্তায়-রাস্তায় অবরোধ গড়ে তোলে. এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল কিন্তু কমিউনিস্টরাই. তাই মনে হয়. এই বিক্ষোভকে মোটেই ভালো চোখে দেখেনি কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ. সবচেয়ে মজার বিষয় হল, কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ উভয়ই এই ধর্মঘটের নিন্দা করেছিল. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তরফে এই বিক্ষোভকে ‘বিভ্রান্তিমূলক’ আখ্যা দেওয়া হয়. ধর্মঘটীদের ‘হিংসাত্মক’ কার্যকলাপের জন্য কড়া নিন্দাও করা হয়. এমনকি সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল বিদ্রোহীদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আত্মসমর্পণ করতেও বলেন. ওই বিদ্রোহীদের পাশে ছিলেন কমিউনিস্ট নেতৃত্ব আর কিছু সমাজবাদী. সেদিন বিদ্রোহীদের হাতে কিন্তু উড়ছিল তিন দলের-ই তথা কমিউনিস্ট, কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের ঝান্ডা.

আসা যাক ‘ভারত ছাড়ো’ প্রসঙ্গে. ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সিপিআই ভারতের ‘সম্পূর্ণ স্বাধীনতা’ চেয়ে এসেছে. ওই দাবিকে নিজেদের মূল লক্ষ্য হিসেবেও বার বার ঘোষণা করেছে. রাস্তায় নেমে আন্দোলনও করেছে. কমিউনিস্টদের যাবতীয় নথি, পুস্তিকা আর ইশতেহারে তাদের এই দাবির কথা প্রতিফলিত হয়েছে. কংগ্রেসের প্রায় এক দশক আগে থেকেই কমিউনিস্ট পার্টি এই অবস্থান গ্রহণ করে. সিপিআই মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দর্শন অনুসরণ করে. তাদের বিশ্বাস, প্রকৃত স্বাধীনতা মানে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা. তার সঙ্গে শোষণ-নিপীড়নের সমস্ত পন্থাকে বাতিল করে দেওয়া. তারা শুধুমাত্র ব্রিটিশদেরই ভারতের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেনি, ভূস্বামী আর পুঁজিবাদী শ্রেণিকেও দেশের শত্রু বিবেচনা করে. তাদের ধারণা, দেশের শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলে ভূস্বামী ও পুঁজিবাদী শ্রেণী. তাই তারা একদিকে ব্রিটিশ শক্তি, আর অন্যদিকে, ভারতীয় পুঁজিবাদী ও জমিদারদের বিরুদ্ধে ভারত জুড়ে কৃষক-শ্রমিক শ্রেণিকে জোটবদ্ধ করার উপর জোর দেয়.

এই প্রেক্ষিতেই ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন নিয়ে সিপিআইয়ের অবস্থান বিশ্লেষণ করা উচিত বলে মনে করে অনেকেই. ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আগে ও পরে – উভয় ক্ষেত্রেই কমিউনিস্টদের অবস্থান ছিল একই — অর্থাৎ বিশ্ব-ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে আপসহীন জঙ্গি সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন. সিপিআই কখনই সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ছাড়েনি. তাদের অবস্থানেরও কোনও রদবদল হয়নি. এই কারণেই যুদ্ধ চলতে থাকা অবস্থাতেও কম্যুনিস্টরা সারা দেশে কৃষক বিদ্রোহ সংগঠিত করতে সক্ষম হয়: যেমন, ১৯৪৩’তে বাংলায় তেভাগা আন্দোলন, ১৯৪৬-৫১-তে হায়দরাবাদ Princely State-এ তেলেঙ্গানা আন্দোলন, ট্রাভাঙ্কোরে ১৯৪৬-তে Punnapra-Vayalar Struggle বা সংগ্রাম, ১৯৪৫-৪৭-তে মহারাষ্ট্রে ‘Revolt of Warlis’ ইত্যাদি ইত্যাদি.

অন্যদিকে, আরএসএস আর হিন্দু মহাসভা কখনই কোনও ব্রিটিশ বিরোধী বিষয়সূচি বা কর্মসূচি ঘোষণা করেনি. তারা কখনই ভারতকে ব্রিটিশদের অধীন থেকে মুক্ত করার কথা বলেনি. কখনও ভারতের স্বাধীনতা অর্জনকে তাদের লক্ষ্য হিসাবে ঘোষণা করেনি. উপরন্তু তারা ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে সর্বতো সহযোগিতা চালিয়ে যায়. এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে নানা সুযোগ-সুবিধা লাভ করে. এমনকি, ১৯৪৭ সালেও আরএসএস আর হিন্দু মহাসভা একই অবস্থান বজায় রাখে. এই অবস্থান থেকে একটুও দূরে সরেনি. তারা ভারত ছাড়ো আন্দোলনকে ‘বর্বর, অমানবিক ও হিন্দুদের জন্য ক্ষতিকারক’ বলে গালমন্দও করে. এমনকি, আরএসএসের দ্বিতীয় প্রধান নেতা ব্রিটিশবিরোধীদের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বলে অভিহিত করেন. তিনি হিন্দুদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিতে নিষেধ করেন. গোলওয়ালকর বলেন, ‘হিন্দুগণ! ব্রিটিশদের সঙ্গে লড়াই করে নিজের শক্তি অপচয় করবেন না; আমাদের অভ্যন্তরীণ শত্রু মুসলিম, খ্রিস্টান আর কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর জন্য আপনাদের শক্তি সঞ্চয় করে রাখুন’.

আজ, দেশে ‘ভারত ছাড়ো’ প্রসঙ্গে কমিউনিস্টদের অবস্থান নিয়ে এতটাই বাজার গরম করা হয়েছে যে, তার সর্বগ্রাসী ছায়ায় ঢাকা পড়ে গেছে স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টদের বিরাট অবদান. তবে সত্যের মৃত্যু নেই. শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না. এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, কমিউনিস্টরা তাদের আন্দোলনের সূচনালগ্ন থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যেই ছিল. প্রকাশ্যভাবে. তাদের ‘সম্পূর্ণ আজাদি’র দাবিকে বাস্তবায়িত করতে তারা একের পর এক সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয়. মাঠে-ময়দানেও নামে. জোর প্রতিরোধ গড়ে তুলে. মিটিং-মিছিল-বিক্ষোভ-ধর্মঘট-অবরোধ – সব প্রকারেই তারা ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল. যা ব্রিটিশবাহিনী তথা তার ভারতীয় সাঙ্গ-পাঙ্গদের রীতিমতো হতাশায় ফেলে দিয়েছিলো. এবং অবশেষে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here