বেঙ্গল ওয়াচ # সাহিত্যের পাতা # দশম সংখ্যা # ৮ নভেম্বর # গল্প # একটা ইন্টারভিউ # সুকুমার রুজ

0
49
###### গল্প # #####
# একটা ইন্টারভিউ।।।।।।
# সুকুমার রুজ।।।।।।।।।।।।।
গাড়িটা যে স্পিডে ছুটছে, মন তার চেয়ে বেশি স্পিডে ছুটতে চাইছে। রিমোটের সাহায্যে গাড়ির গতিকে কন্ট্রোল করা গেলেও, মনকে কন্ট্রোল করার কোনও রিমোট নেই। ‘সিলেকশন কমিটি’ থেকে পাঠানো ডিজিটাল ইন্টারভিউ কার্ড-এর নীচে ফুটনোট দেওয়া রয়েছে, ‘পাংচুয়ালিটি ইজ দা ফার্স্ট প্রায়োরিটি।’ তার মানে, ঠিক সময়ের মধ্যে রিপোর্ট করা জরুরি। সামান্য কারণে বাতিল হয়ে গেলে খুব খারাপ লাগবে। এমনিতেই আমার কাছে কম্পিটিশনটা খুব একটা টাফ মনে হচ্ছে না। একটু চেষ্টা করলেই হয়ত…! মাত্র একশো  জন কম্পিটিটর। তার মধ্যে আটটা পোস্ট রিজার্ভড। অবশিষ্ট বিরানব্বই জনের মধ্যে আঠারো জনকে সিলেক্ট করা হবে। প্রত্যেক দেশ থেকে একজন নির্বাচিত হবে। আমার দেশ থেকে মাত্র পাঁচ জন পার্টিসিপেট করছে। সিলেক্ট  হওয়া এমন কিছু কঠিন নয়। পোস্টটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক। ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ আন্ডার ডেভেলপিং কান্ট্রিজ’-এর ‘বোর্ড অফ ডিরেক্টরস’-এর পার্সোনাল সেক্রেটারিজ। এ‌ পোস্ট পাওয়া মানে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। তাই সব কিছু ঠিকঠাক ভাবে হওয়া দরকার। এখনও অবধি সব ঠিকই আছে, আশা করা যায় ইন টাইম পৌঁছে যাব।
মাই গড! সিগনাল রেড হয়ে গেল! মাত্র পাঁচ সেকেন্ড অ্যাডভান্সড থাকলেই…! পাঁচ সেকেন্ডের জন্য দু’মিনিট সময় নষ্ট হবে। সার্কিট হাউসের আরদালির কাছ থেকে কানাঘুষোয় জানা গিয়েছে, সার্কিট হাউস টু সেনেট হাউস এই জার্নিটাও নাকি ইন্টারভিউয়ের পার্ট। গাড়ির ভেতরে নাকি হিডেন ক্যামেরা সি সি রেকর্ডার এ সব বসানো আছে। প্রত্যেকটা মুভমেন্ট অ্যান্ড এক্সপ্রেশন নাকি রেকর্ডেড হচ্ছে। এমনকী কী ভাবে আমি গাড়ির রিমোট অপারেট করছি সেটাও। রিমোট বাটনে আঙুলের প্রেসারের মধ্যে কতখানি সেল্ফ-কনফিডেন্স আছে সেটাও মাপা হচ্ছে বোধহয়! থাকাটা অ্যাবসার্ড নয়। পোস্টটা এমনই, এ কাজে আত্মবিশ্বাস আর সিদ্ধান্ত নিতে পারাটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই আঠারো জনের সময় মতো সঠিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে আঠারোটা দেশের, পরোক্ষভাবে সারা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতি…
কিন্তু এখন যে সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। না, টাইম ইজ প্রিসিয়াস! মোটেও নষ্ট করা যাবে না। বরং এই সময়টুকুর মধ্যে একটু নিউজ হেডলাইনে চোখ বুলানো যাক। ইন্টারভিউয়ে কাজে লাগতে পারে।
আরে! এ নিউজটা তো আগে দেখিনি!
— ‘মনোবিজ্ঞানীরা যতই দাবি করুক, পৃথিবী থেকে কিনশিপিয়া, লাভেরিয়া এই সব রোগ নির্মূল হয়ে গিয়েছে, বাস্তবে তা হয়নি। এখনও কিছু মানুষের মনে অপত্যস্নেহ মায়া-মমতা, সম্পর্কের টান ভালবাসা এ সব আবর্জনা রয়ে গিয়েছে। তারই প্রমাণ মিডল ইস্ট রিফিউজি কলোনির এক মহিলা…
এই এক হয়েছে রিফিউজি কলোনি! তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন বিধ্বস্ত দেশের বেঁচে থাকা মানুষগুলোকে এনে কলোনি তৈরি করে শেল্টার দেওয়া। কিন্তু তাদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা তো নেই বললেই চলে! শুয়োরের খোঁয়াড়ে শুয়োররাও ওদের চেয়ে যত্নে থাকে। সে দিন দেখলাম, রিফিউজিদের সুষ্ঠু ব্যবস্থার দাবি নিয়ে মাথায় টুপি আর পায়ে মোজা পরে, উলঙ্গ বুদ্ধিজীবীদের সিম্বলিক প্রসেশন। যদিও তাতে আদৌ কোনও পরিবর্তন হয়নি।
ও মাই গড! এখন দেখছি রাস্তা দিয়ে প্রসেশন পাস করছে। বেশ কিছু মানুষ হাতে প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছে। পুরুষ বেশি নারী সংখ্যায় কম। প্ল্যাকার্ডগুলোতে লেখা রয়েছে
— ক্লোনিং ইজ আওয়ার বার্থ রাইট, ডু ক্লোনিং লিগালি, গ্রো মোর ফিমেল ক্লোন বেবি, এই সব কথা।
থাক, এ সব নিয়ে এখন ভাবার সময় নেই। ও দিকে সিগন্যাল অন হচ্ছে না, টেনশন বাড়ছে। কিন্তু চোখেমুখে টেনশন ফুটে উঠতে দেওয়া যাবে না। কোথায় যে হিডেন ক্যামেরা বসানো রয়েছে!
যাক, প্রসেশনটা শেষ হল। কিন্তু সিগন্যাল গ্রিন হচ্ছে না কেন! কোথাও থেকে সাইরেনের আওয়াজ আসছে। ভি আই পি পাসিং না অ্যাম্বুল্যান্স, কে জানে! ওটার জন্যই হয়তো… এ সব বোধহয় সিলেকশন কমিটির কারসাজি। ইন্টেনশনালি টেনশনে ফেলা।
আচ্ছা! টেনশনে কি ঘাম হচ্ছে! শার্টের ভিতর কেমন সুড়সুড় করছে। ঘাম হওয়ার তো কথা নয়! হিউমিডিটি কম, ড্রাই ওয়েদার। গাড়ির ভেতরে টেম্পারেচার দেখাচ্ছে ফিফটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাইরে তো পঞ্চান্ন-ছাপান্ন হবে। এখন তো এটাই নরমাল। বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর টেম্পারেচারটা কেন যে এত বেড়ে গেল! বাড়বে না-ই বা কেন! যা সব অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহৃত হল!
আরে! এটাও ইন্টারভিউয়ের কোয়েস্ট হতে পারে — থার্ড ওয়ার্ল্ড-ওয়রে কী সব অস্ত্রশস্ত্র… মনে মনে আনসারটা একটু সাজিয়ে নেওয়া যাক।
থ্যাংক গড! গ্রিন সিগন্যাল। এ রাস্তায় নিশ্চয় স্পিড লিমিট আছে। কত তা জানা নেই। কিন্তু স্পিড না তুললে তো… গাড়ির নেভিগেটর স্ক্রিনে দেখাচ্ছে সেনেট হাউস পৌঁছতে এখনও তিন মিনিট কুড়ি সেকেন্ড লাগবে। ন’টা বাজতে আর মাত্র তিন মিনিট বাকি। অর্থাৎ, এই স্পিডে গেলে তো অবভিয়াসলি লেট। রিমোটের স্পিড-বাটনে আঙুলের চাপ বাড়ে।
চেকিং স্ট্যান্ডে এক্সপ্লোসিভ-ডিটেক্টর মেশিন গ্রিন সিগন্যাল দেওয়ার পর ফোটো-সেনসিটিভ স্লাইডিং ডোরের সামনে দাঁড়াতেই দরজা খুলে গেল। ঢুকেই ডান দিকে অ্যাটেনডেন্স পাঞ্চ-মেশিন। স্ক্রিনে ইন্টারভিউ-কার্ড সোয়াইপ করতেই টাইম ফুটে উঠল— ন’টা বেজে এক মিনিট পাঁচ সেকেন্ড। মানে এক মিনিট পাঁচ সেকেন্ড লেট, এমন কিছু নয়। আশা করা যায়, প্রবলেম হবে না। ডিজিটাল স্ক্রিনে লেখা ফুটে ওঠে— মিস্টার এস থার্টি, ইউ আর দ্য থারটি নাইন্থ পারসন অ্যাকর্ডিং টু ইওর অ্যাটেনন্ডিং টাইম। ওয়েট হিয়ার ফর এ হোয়াইল।
বেশ কিছুক্ষণ ওয়েট করার পর ডিজিটাল স্ক্রিনে ফুটে উঠল এবং অদৃশ্য স্পিকারে ঘোষণা হল, ‘মিস্টার এস থার্টি, দিস ইজ ইওর টার্ন। প্লিজ কাম ইনসাইড দ্য কনফারেন্স রুম। টার্ন রাইট। ইওর নাম্বার ইজ নাইন।’
কিউবিকলে ঢুকে দেখি, টেবিলে একটা কম্পিউটার-মনিটর। তার সামনে একটা চেয়ার। আর কিছু নেই। কোনও মানুষ নেই। মনিটরের পাশে রাখা স্পিকার থেকে কথা ভেসে আসছে— বি সিটেড প্লিজ!
চেয়ারে বসি।
আবার কথা ভেসে আসে। সবই ইংরেজিতে, যার বাংলা করলে মোটামুটি এই রকম দাঁড়ায়— মিস্টার এস থার্টি! আমাদের এই কথোপকথনকে পরীক্ষা ভাববেন না। এটাকে একটা আলোচনা ভাবতে পারেন। এই আলোচনার মধ্যে দিয়েই আমরা বুঝে যাব, আপনি এই পদ পাওয়ার যোগ্য কি না। আসুন, আমরা শুরু করি। তার আগে জানতে চাইব, আপনি দেরিতে পৌঁছলেন কেন?
আমিও ইংরেজিতেই উত্তর দিই— হ্যাঁ, একটু দেরি হয়ে গেল। মাত্র এক মিনিট পাঁচ সেকেন্ড। এই অনিচ্ছাকৃত দেরির জন্য আমি দুঃখিত।
আপনি নিশ্চয়ই জানেন, এক মিনিট পাঁচ সেকেন্ড কেন, মাত্র পাঁচ সেকেন্ড দেরির জন্য স্যাটেলাইট কক্ষপথে না পৌঁছে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। মিসাইল টার্গেট মিস করতে পারে। স্পার্ম, ওভামকে ফার্টিলাইজ করা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বুঝলাম আমার ইন্টারভিউ বা আলোচনা যাই হোক, সেটা শুরু হয়ে গিয়েছে। তাই আমি খুব সতর্ক হয়ে কথা বলা শুরু করলাম— আসলে রাস্তার সিগনালে…
রাস্তায় সিগন্যাল তো থাকবেই!
না, মানে মিছিল পাস করছিল তাই…
ও! প্রসেশন। তা কাদের প্রসেশন, নিশ্চয় আপনি দেখেছেন?
হ্যাঁ, কোনও রাজনৈতিক দল নয়, সাধারণ মানুষ, যারা মানুষের ক্লোন করে মানুষ তৈরিকে আইনসিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছে।
আপনার কি মনে হয়, এ দাবি মেনে নেওয়া উচিত? যদি দাবিকে সমর্থন করেন, তা হলে তার পক্ষে যুক্তি দিন। আর সমর্থন না করলে, কেন করেন না, বলুন!
আমার মনে হয় স্যার, ওদের দাবি অযৌক্তিক নয়। কেননা, কন্যাভ্রূণ হত্যা হতে হতে, বর্তমান পৃথিবীতে পুরুষ ও নারীর অনুপাত থ্রি ইজ টু ওয়ান। তা ছাড়া, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধতে রাসায়নিক বোমা ও হার্মফুল রেডিয়েশনে বেশির ভাগ নারী পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। মানুষ প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, আপাতত ক্লোন করে কিছু মানুষ উৎপাদন করা দরকার।
কিন্তু মিস্টার এস থার্টি, যার কোষ নিয়ে ক্লোন করে মানুষ তৈরি করা হবে, আকৃতি-প্রকৃতিগত ভাবে তার সঙ্গে ক্লোন-ম্যানের সব কিছু মিলে যাবে। মেধাগত উন্নতি থেমে যাবে। সমাজ-সংস্কৃতির কোনও আপগ্রেডেশন হবে না। তা ছাড়া একটা পরিবারে সবাই একই রকম দেখতে হলে, পারিবারিক জীবনে অসুবিধা হবে বলে আপনার মনে হয় না?
হ্যাঁ, কিছু অসুবিধা তো হবেই! সে ক্ষেত্রে আইডেন্টিফাই করার জন্য কিছু প্রমিনেন্ট আইডেন্টিফিকেশন মার্কের ব্যবস্থা করতে হবে।
তা না হয় করা গেল। কিন্তু তাদের সকলের চরিত্র তো একই রকম হবে! অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদীর ক্লোন-ম্যানও  সন্ত্রাসবাদী হবে। খুনির ক্লোন করালে খুনি হবে। তার চেয়েও সমস্যার কথা, বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে এ রকম  কিনশিপ বা ‘জ্ঞাতিত্ব’ বলে সোসাইটিতে কিছু থাকবে না।
আমি একটু সময় নিই, মনে মনে পরের কথাগুলো সাজাতে থাকি। এমন সময় কম্পিউটার বলে ওঠে, ‘আপনি কি জল খাবেন?’
সম্মতি-সূচক ঘাড় নাড়তেই কিউবিকলের সিলিং থেকে একটা ফাইবার ক্ল্যাম্প আলতো করে নেমে আসে আমার সামনে, যেটার মধ্যে একটা গ্লাসে দু’আউন্স মতো জল রয়েছে। আমি গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে জলটুকু পান করি। আর একটু পান করার ইচ্ছা ছিল, গলাটা শুকিয়ে গেছে। কিন্তু আজকাল বিনামূল্যে কোথাও কাউকে পানীয় জল দেওয়া হয় না। ভদ্রতার খাতিরে দিলেও মাত্র দু’আউন্স। সমুদ্রের জল রিফাইন করে পানীয়র উপযুক্ত করার খরচ যে অনেক!
আমি দু’আউন্স-এই তৃপ্তি সূচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করে কথা বলা শুরু করি— এখনও তো সেটা নেই স্যার! তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমাজ-জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখন বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে প্রেম-ভালবাসা, মায়া-মমতা, অপত্য-স্নেহ, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতাবোধ এগুলোকে মানসিক রোগ হিসেবে ধরা হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এখন শুধু একটা বিষয়ে, তা হল সেক্স-প্লেজার, যৌন সুখানুভূতি। নারী-পুরুষে, পুরুষে-পুরুষে, অথবা নারীতে-নারীতে এখন এই একটা ব্যাপারেই সম্পর্ক তৈরি হয়। সেটা শারীরিক সম্পর্ক, মানসিক নয়। তবে সত্যি কথা বলতে কী, এই সম্পর্কও আর বেশি দিন থাকবে না। মানুষ এখন সেক্স-প্লেজার পেতে পলিডল, রাবার-অরগ্যান এ সব ইউজ করছে। এখন ফিমেল-ক্রাইসিসের যুগ। এখন আর রেড লাইট এরিয়া বা ব্রথেল নেই। তার জায়গায় সারি সারি পলিডল সেন্টার রমরমিয়ে ব্যবসা করছে।
দেখুন মিস্টার এস থার্টি, প্রয়োজন ও সহজলভ্যতার নিরিখে সমাজে কিছু পরিবর্তন তো আসবেই!‌ সেটাকে তো মেনে নিতেই হবে।
স্বাভাবিক পরিবর্তন অবশ্যই মেনে নিতে হবে স্যার! কিন্তু এখন অস্বাভাবিক ভাবে মানুষের ব্যাপক মানসিক পরিবর্তন হয়েছে। এমনিতেই মানুষ এখন নরম্যাল সেক্সে ডিসকারেজড হয়ে পড়ছে। উপযুক্ত নারীর খুব অভাব। চাঁদে জায়গা কেনার মতো কেউ যদিও বা ভাগ্যক্রমে নারী পাচ্ছে, তাতেও সে তৃপ্ত হচ্ছে না। শুধুমাত্র ফিমেল-বডি এনজয় করা নয়, তার সঙ্গে ফ্যামিলিয়াল রিলেশনশিপকেও উপভোগ করতে চাইছে। এটা এখনকার ট্রেন্ড। তাই বাবা, মেয়েকে ব্যবহার করছে। দাদা, বোনকে ব্যবহার করছে। কিংবা মা, ছেলেকে। যাতে শরীর-সম্ভোগের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক-সম্ভোগের আনন্দটাও পাওয়া যায়। তা হলে আর কিনশিপ বা ‘জ্ঞাতিত্ব’, মানে রক্তজনিত সম্পর্ক ব্যাপারটা থাকছে কোথায়!
দেখুন, আপনার কথাই না হয় ধরে নিলাম, কিনশিপ টাইম-ব্যারেড হয়ে গেল। রক্তজনিত সম্পর্কটাই থাকল না। তখন মানুষের এই সম্পর্ক-সম্ভোগ ব্যাপারটাই তো শেষ হয়ে যাবে। এতে আর মানুষ আনন্দ পাবে না। তখন মানুষ বা সমাজ কোন দিকে টার্ন নেবে? কী ব্যবস্থা নেবে?
এখনই তার অল্টারনেটিভ চালু হয়ে গেছে স্যার!
তাই নাকি! কী রকম একটু বলবেন!
এখন স্যার, বেশ কিছু দেশের মানুষের ট্রেন্ড হল, ডিগনিটি-এনজয়মেন্ট, অর্থাৎ সম্ভ্রম-সম্ভোগ। ইয়ং জেনারেশনের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ডিগনিফায়েড পারসোনালিটির বেড-পার্টনারকে এনজয় করার টেন্ডেন্সি। কলেজ-স্টুডেন্টরা নিজের প্রফেসরের ওয়াইফকে এনজয় করছে। অফিস-স্টাফরা বস-এর বেড-পার্টনারকে নিজের বেড-পার্টনার করতে চাইছে। বস-এর পছন্দের জিনিসকে সে সম্ভোগ করছে এটাই গর্বের। এখানে সেক্স-প্লেজারের চেয়ে ডিগনিটি-এনজয়মেন্ট প্রাধান্য পাচ্ছে স্যার!
দেখুন, আপনি যা বলছেন তাতে তো মনে হচ্ছে, আর বছর দশেক পরে সোসাইটি বা সমাজ বলে কিছু থাকবে না। এ ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?
আমি কয়েক সেকেন্ড থেমে থাকি। তার পর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলি, ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেখানে উদ্ভিদ, ছোটখাটো পশুপাখি বিলুপ্তির পথে, যেখানে বাধ্য হয়ে মানুষের খাদ্যাভ্যাস থেকে যাপন-প্রণালীর সব কিছুই বদলাতে হয়েছে, ভাতরুটির পরিবর্তে সিন্থেটিক ফুড-কেক আর এনার্জি ট্যাবলেট, পোশাক বলতে এই সিন্থেটিক গাউন, ক্যাপ আর জুতো মোজা। বাসস্থান বলতে গ্রাউন্ড লেভেল থেকে মিনিমাম দশ ফুট উপরে হিট-প্রটেক্টেড রুম, সেখানে সমাজের সংজ্ঞাও অবশ্যই বদলাতে হবে। তখন আর মানুষ সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে পরিগণিত হবে।
কম্পিউটারের স্পিকারে গমগমে কণ্ঠস্বর— তা হলে সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রনীতিরও পরিবর্তন করতে হয়, তা না হলে দেশ চালানো যাবে কী ভাবে?
একদম ঠিক স্যার। আমারও তাই অভিমত। তবে…
আমাকে প্রায় থামিয়ে দিয়ে কম্পিউটার বলে ওঠে— কিন্তু এখনও কোনও কোনও দেশে সমাজতন্ত্র বহাল আছে। ধনতান্ত্রিক দেশও আছে। যদিও বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যাই বেশি।সে সবের কী পরিবর্তন হবে?
আমাকে যেন চ্যালেঞ্জিং অ্যাটিটিউড পেয়ে বসেছে। আমি যে ইন্টারভিউ দিতে এসেছি, তা ভুলেই গেছি। আমি বলে উঠি, ‘সিস্টেম পাল্টাতে হবে স্যার।’
বিকল্প বলুন!
বিকল্প হল— ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিলের মাধ্যমে সরকার চালানো।
ঠিক বুঝলাম না, একটু ডিটেইলস-এ বলুন।
দেখুন, আমরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও, আসলে দেশ চলছে ধনতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই। জনগণের মতামতকে সে ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ধনকুবের বা ‘মাল্টি-মিলিয়নিয়ার’রাই পরোক্ষভাবে দেশ চালায়। দেশের ভার তো রাজনৈতিক দলের হাতে, রাজনৈতিক দল ধনকুবেরদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেয়, সরকার গড়ার পর ওদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার শর্তে। ক্ষমতায় আসার পর সেই দল জনগণের স্বার্থ বা দেশের উন্নতির কথা না ভেবে, ধনকুবেরদের স্বার্থ ও নিজের অর্থনৈতিক উন্নতির কথা ভাবে। অথচ সে দল কিন্তু জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়। বিপক্ষ রাজনৈতিক দল চিৎকার-চেঁচামেচি ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। তাই এ পদ্ধতি ব্যাকডেটেড। যদি রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে দেশে একাধিক ‘ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিল’ তৈরি হয় এবং তাদের যে কোনও একটি কাউন্সিল শর্তসাপেক্ষে সরকার চালানোর দায়িত্ব পায়, তা হলে তারা নিজেদের স্বার্থেই দেশের জনগণের উন্নতি করতে বাধ্য হবে।
সেই কাউন্সিলকে কি জনগণ নির্বাচিত করবে?
না, সত্যি কথা বলতে কী, এখনকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেও জনগণের তেমন কোনও ভূমিকা নেই, তখনও থাকবে না। যে কাউন্সিল সরকারের ফান্ডে বেশি টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করবে, সেই কাউন্সিল সরকার গঠন করবে ও চালাবে। তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে জনগণের ভোট দেওয়ার ঝামেলা থাকবে না। নিজেদের মধ্যে মারামারিও থাকবে না।
তা হলে, সাধারণ মানুষের তো কোনও ভূমিকায় থাকবে না!
অবশ্যই থাকবে স্যার! এখন যেমন সাধারণ মানুষ কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক, তখনও জনগণ কোনও না কোনও ক্যাপিটালিস্ট কাউন্সিলের সদস্য হবে এবং সেটা হবে বাধ্যতামূলক। তা ছাড়া জনগণ নিজের তাগিদেই কোনও না-কোনও কাউন্সিলের সদস্য হবে। তাতে তার বাঁচার সুবিধা। যেমন ধরুন, বৃদ্ধ বাবা-মা কিংবা দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া ছেলেমেয়েকে ওই কাউন্সিলের অধীনে থাকা লিম্ব-সাপ্লাইয়ার্সের কাছে ভাল দামে বিক্রি করতে পারবে। অন্য কাউন্সিল বেশি দাম দিয়ে লাইভ-কিডি কিনবে না। ফার্ম হাউসে রাখার খরচ তো কম নয়! তাই অপ্রয়োজনীয় ফ্যামিলি-মেম্বারকে বেশি দামে কাটাই-এ বিক্রি করার লোভে, মানুষ কোনও‌ না-কোনও কাউন্সিলের মেম্বারশিপ নেবেই! নিশ্চয়ই জানেন, একজন পৃথিবী বিখ্যাত ইকোনমিস্ট বলেছেন, ‘উই আর মিয়ারলি অ্যান ইকোনমি, নট আ সোসাইটি।’ তাই বর্তমানে মানুষের অ্যাটিটিউড হল, বাই হুক অর ক্রুক, আর্ন মোর অ্যান্ড মোর মানি। একটা নির্ধারিত পরিমাণ টাকার মালিক হলেই সে কোনও না-কোনও কাউন্সিলের মেম্বারশিপ নিতে পারবে। টাকার বিনিময়ে ইকুইটি শেয়ার কেনার মতো আর কী। তখন প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই একটা চেষ্টা থাকবে, ওই নির্ধারিত পরিমাণ টাকার মালিক হওয়া। মানবিক মূল্যবোধ শেষ হয়ে যাওয়াটা এর পক্ষে আরও সহায়ক হবে। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হবে স্যার।
এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি কী ভাবে হবে? ক্ষমতাসীন কাউন্সিল তো নিজের ক্যাপিটাল বাড়ানোর চেষ্টায় থাকবে, দেশের কী উপকার হবে?
স্যার, নিজের ক্যাপিটাল বাড়াতে হলে তো জনগণের টাকা নিয়েই বাড়াতে হবে। অর্থাৎ জনগণের ক্রয়-ক্ষমতা বাড়াতে হবে। ক্রয়-ক্ষমতা বাড়াতে হলে জনগণের উপার্জন বাড়াতে হবে। উপার্জন বাড়াতে গেলে জনগণের কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আর কর্মসংস্থান বাড়াতে গেলে কল-কারখানা বা বিভিন্ন ব্যবসা বাড়াতে হবে। ক্যাপিটালিস্ট-রা নিজের স্বার্থেই তা করবে। এতে পরোক্ষ ভাবে জনগণ ও দেশের উন্নতি হবে।
ধরে নিলাম তা হবে। কিন্তু প্রভূত অর্থশালী হওয়ার লোভে মানুষের মানবিক গুণ বিবেক মনুষ্যত্ব-বোধ এ সব লোপ পাবে। তখন মানুষের ডেফিনেশনও পাল্টাতে হবে। মানুষ আর তখন মানুষ থাকবে না, যন্ত্রে পরিণত হবে।
আমার কেমন হাসি পেয়ে যায়। আমি বলে উঠি, ‘এখন কি মানুষ যন্ত্রে পরিণত হয়নি স্যার! এই যে আমি এতক্ষণ কথা বলছি একজন যন্ত্রের সঙ্গেই তো! আমার সামনে তো কোনও মানুষ নেই।’
তা না থাকলেও মানুষের গুণাবলি, আই মিন, এ ধরনের আলোচনা করার মতো ডেটা এই যন্ত্রের মধ্যে প্রোগ্রামিং করা হয়েছে। তাই আপনার সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণ করা যাচ্ছে। যদিও আমি একটা যন্ত্র।
স্যার, ভাল করে ভেবে দেখলে মানুষও তো একটা যন্ত্র। মানুষের ব্রেন একটা উন্নত মানের সুপার-কম্পিউটার। এই মানব-জীবন ও সমাজ-জীবনের যে পরিবর্তন, তা আর কিছুই নয়, প্রোগ্রামের আপগ্রেডেশন বা অলটারেশন। যেমন উইন্ডোজ সেভেন থেকে উইন্ডোজ এইট, এইট থেকে নাইন, টেন, ইলেভেন। ব্যাকডেটেড প্রোগ্রাম ফেলে দিয়ে আপগ্রেডেড প্রোগ্রামিং লোড করা হচ্ছে।
তা হলে তো মানুষ আর যন্ত্র প্রায় কাছাকাছি হয়ে যাবে। তা হলে ক্লোন করে মানুষ না বানিয়ে রোবট বানানো ভাল। তবে ক্লোন নিয়ে এত আন্দোলন করার কী আছে?
এর পেছনে কারণ হল, সংরক্ষণ বা প্রিজারভেশন। এখন অবধি মানুষের মধ্যে যে মানবিক গুণাবলি রয়েছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত ও সংরক্ষিত করার জন্যই ক্লোনিংয়ের প্রয়োজন। যেহেতু প্রজনন পদ্ধতি প্রায় শেষ হতে চলেছে।
রোবটের মধ্যেই ওই সব গুণাবলি প্রোগ্রামিং করে নিলেই তো হয়!
ঠিক বলেছেন স্যার! এক সময় দেখা যাবে, এখনকার মানুষের মধ্যে যে সমস্ত জৈবিক ও মানবিক গুণাবলি রয়েছে, তা কম্পিউটারে প্রোগ্রামিং করা হবে। তখন কম্পিউটার আনন্দে হাসবে, দুঃখে কাঁদবে, প্রেম করবে। আর মানুষ তখন আপগ্রেডেড হয়ে আবেগ-অনুভূতির বাইরে চলে যাবে। তখন আর কমন পিপল বলে কিছু থাকবে না। কান্ট্রির কনসেপ্টই চেঞ্জ হয়ে যাবে। ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ আন্ডার ডেভেলপিং কান্ট্রিজ’ বলে কিছু থাকবে না।
তা যদি না থাকে, তা হলে আপনি যে পদপ্রার্থী হয়ে এসেছেন, সে পদের তো কোনও প্রয়োজন হবে না।
আমার মনে হয় স্যার অ্যাসোসিয়েটেড হওয়ার জন্য এ পদের প্রয়োজন আরও বেশি হবে। কেননা, মানুষ, সমাজ, দেশ বা বিশ্বের যা গতিপ্রকৃতি, তাকে প্রতিরোধ করার জন্য কিংবা সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্যই এই পদের কার্যকারিতা আরও বেড়ে যাবে।
আচ্ছা, মিস্টার এস থার্টি, সবশেষে একটা প্রশ্ন করব আপনাকে। বলছি যে, আপনি যে পদপ্রার্থী হয়ে আমার সামনে বসে আছেন,‌ আপনি কি নিজেকে তার যোগ্য বলে মনে করেন?
দেখুন স্যার, যোগ্য কেউ হয়ে আসে না, যোগ্যতর করে নিতে হয়। ইন্টারভিউ বা ডিসকাশন-এর মধ্যে দিয়ে আমার ব্রেন-কম্পিউটারের ক্যাপাসিটি যাচাই করা হল। এ বার সেখানে নতুন ডেটা প্রোগ্রামিং করে আমাকে এই পদের যোগ্য করে তোলা হবে ব’
লে আমি মনে করি।
ওয়েল সেড! কিন্তু তার জন্য আপনার ভেতর থেকে বেশ কিছু ডেটা ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে। আপনি তাতে রাজি তো?
কী ধরনের ডেটা স্যার?
ওই যে আপনি বললেন, মানবিক গুণ-স্নেহ-মায়া-মমতা, প্রেম-প্রীতি-ভালবাসা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-কষ্ট এসব আন-ইন্সটল করে দেওয়া হবে। তবেই আমাদের ডেটা আপনার মধ্যে ইন্সটল করা যাবে। আপনি রাজি তো?
আমি বেশ ধাঁধায় পড়ে যাই। বুঝে উঠতে পারি না, ‘হ্যাঁ’ বলব কি ‘না’ বলব। এমন সময় কম্পিউটার হো হো করে হেসে ওঠে। হাসি থামিয়ে বলে, ‘দেখুন, আমার মধ্যে কিন্তু আবেগ-অনুভূতি টেম্পরারিলি ইন্সটল করা হয়েছে আপনার অনুভূতিকে জাস্টিফাই করার জন্য। তাই আপনার এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ়  অবস্থা দেখে এমন হেসে উঠতে পারলাম।’
আমি কয়েক পলক নির্বাক হয়ে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ দেখি, মনিটর আইডল থাকার জন্য স্ক্রিন-সেভার অন হয়ে গেছে। স্ক্রিনে একটার পর একটা পুরনো দিনের ছবি স্লাইডিং হতে থাকে। কোনটা শিশুকে মায়ের আদর করার ছবি, কোনটা বয়স্ক মানুষ ঘোড়া সেজেছে, তার পিঠে একটা বাচ্চা ছেলে বসে খিলখিলিয়ে হাসছে। একের পর এক ছবি ফুটে উঠছে— বিয়ের সাজে নবদম্পতি, নারী-পুরুষের নিবিড় আলিঙ্গন, যুবকের হাত ধরে অন্ধ বৃদ্ধের রাস্তা পার, এমন অনেক ছবি।
সে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি কেমন হতবাক হয়ে যাই। উত্তর দিতে ভুলে যাই। এক সময় একটা বিপ বিপ শব্দ হতে থাকে। আমার সম্বিত ফেরে। দেখি, মনিটরে ছবিগুলো চলে গিয়ে হেলভেটিকা ফন্টে লেখা ফুটে উঠেছে— ‘ইওর টাইম ইজ আপ, স্যরি, ইউ আর ক্যানসেলড।থ্যাংক ইউ ফর লিভ দ্য কিউবিকল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here