বেঙ্গল ওয়াচ # সাহিত্যের পাতা # দ্বাদশ সংখ্যা # সম্পাদকের কলমে # অর্ধেন্দু চক্রবর্তী নয়, আমার কাছে উনি হারুদাই # সিদ্ধার্থ সিংহ

0
48
সম্পাদকের কলমে
অর্ধেন্দু চক্রবর্তী নয়, আমার কাছে উনি হারুদাই
সিদ্ধার্থ সিংহ
শান্তনুদা বলেছিলেন, বিকেলে কী করছিস? বাড়িতে চলে আসিস। হারুদার বাড়ি যাব।
আমি গিয়েছিলাম।
গোপালনগর থেকে ট্যাক্সি ধরে নিউ আলিপুর ব্রিজ টপকে কালীঘাট স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেনে করে সন্তোষপুর।
ট্রেন থেকে নামতেই সে কী অন্ধকার! চারিদিকে চিকচিক করছে জোনাকি। রাস্তায় কোথাও কোনও লোকজন নেই। মনে হচ্ছে মধ্যরাত।
দু’-একটা শিয়াল ডাকছে। আমি তো অবাক। এমন গণ্ডগ্রামে আবার কেউ থাকে নাকি!
হারুদাটা কে? লেখালেখি করে? নিশ্চয়ই করে। তা না হলে শান্তনু দাসের মতো লোক এখানে আসবে কেন!
শান্তনু দাস মানে কাস্তে কবি দিনেশ দাসের ছেলে।
এখন যাঁরা বাংলা সাহিত্যে করেকম্মে খাচ্ছেন, তাঁরা তখনও কেউ কবিতার জগতে সে ভাবে আসেননি।
তখন দাপিয়ে বেড়াতেন একমাত্র শান্তনু দাস।
হাজরা মোড়ের বসুশ্রী সিনেমা হলের দোতলার কফি হাউসে রবিবার বেলা ১১টা ১২টা নাগাদ শুধু ওঁর জন্যই উন্মুখ হয়ে বসে থাকতেন ২০-৩০ জন কবি।
তখন বাংলার সব চেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা বীরেন সিমলাইয়ের ‘ঘরোয়া’ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ দেখতেন এই শান্তনু দাস।
ওখানে একটি কবিতা প্রকাশিত হলে একজন কবি এক রাতেই ১০০ মাইল এগিয়ে যেতেন।
তখনও কবি জীবনানন্দ দাশ সে ভাবে উঠে আসেননি। রবীন্দ্র পরবর্তী কবি বলতে একমাত্র বিষ্ণু দে।
আমার মনে আছে, সেই ঘরোয়া পত্রিকায় শান্তনুদা একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি নায়ক উত্তমকুমারের।
সেই সাক্ষাৎকারে শেষ প্রশ্ন ছিল, এই মুহূর্তে কার কবিতা আপনার ভাল লাগে?
সেখানে উত্তমকুমার তিন জন কবির নাম বলেছিলেন। ১) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২) নজরুল ইসলাম। আর ৩) বিষ্ণু দে।
তখন নিয়ম ছিল, জনপ্রিয় কারও সাক্ষাৎকার নিলে, সেই সাক্ষাৎকার লেখার পরে যাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁকে পড়িয়ে সেই লেখাটার নীচে সই করিয়ে আনা।
আমি সেই সাক্ষাৎকারটা উত্তমকুমারের পূর্ণ সিনেমা হলের উল্টো দিকের ভবানীপুরের বাড়ি গিয়ে সই করিয়ে এনেছিলাম।
কিন্তু লেখাটা যখন ছাপা হল, তখন দেখলাম ওই তিন জনের নামের প্রথম দু’জনের নাম আছে ঠিকই, কিন্তু বিষ্ণু দের জায়গায় লেখা শান্তনু দাস।
পরে বুঝেছিলাম, প্রুফ দেখতে গিয়ে শান্তনুদা নিজেই বিষ্ণু দের নামটা কেটে নিজের নাম বসিয়ে দিয়েছিলেন।
শান্তনু দাসই একমাত্র কবি, যিনি বিভিন্ন কবির কবিতা নিয়ে প্রথম কবিতার সংকলন প্রকাশ করেছিলেন। নাম— কালের কবিতা।
শান্তনু দাসই প্রথম মানুষ, যিনি স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া থেকে লোন নিয়ে কবিতার সংকলন প্রকাশ করেছিলেন।
তিনিই প্রথম বলেছিলেন, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের যদি ছবি ছাপা হতে পারে, তা হলে একজন কবির ছবি কেন ছাপা হবে না?
তিনিই প্রথম কবিদের ছবি ছাপার প্রচলন করেন। তখনকার দিনে ছবি ছাপা এত সহজ ছিল না। জিঙ্কের ব্লক তৈরি করতে হতো। সেটা ছিল বেশ খরচ সাপেক্ষ। তাও ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট।
কবিদের নিজেদের বেছে দেওয়া কবিতা নিয়ে চোখধাঁধানো প্রথম কবিতার সংকলন প্রকাশ করেছিলেন তিনিই। সেই সংকলনের নাম— স্বনির্বাচিত। যেমন কাগজ তেমনি ছাপা। তেমনি তার প্রচ্ছদ।
আধুনিক প্রজন্মের মধ্যে তিনিই প্রথম একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন— কাফের। কবিতাটি এতটাই বড় যে, শুধুমাত্র ওই একটি কবিতা নিয়েই একটি কাব্যগ্রন্থ বেরোয়।
সেই ‘কাফের’ এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, তাঁরই দশকের আর এক কবি, পবিত্র মুখোপাধ্যায় সেই ‘কাফের’ অনুকরণ করেই লিখে ফেলেন— ইবলিশের আত্মদর্শন।
বেশ মনে আছে, সেই বইটির প্রথম মুদ্রণের বছরখানেক পরেও দশ-বারো কপি আদৌ বিক্রি হয়েছে কি হয়নি, খাটের তলায় স্তূপাকৃত করে রাখা আছে বান্ডিল কে বান্ডিল বই।
ঠিক তখনই, প্রথম মুদ্রণ নিঃশেষিত হয়ে গেছে, বইটির জন্য বাংলা কবিতার পাঠকেরা একেবারে মুখিয়ে আছেন, এই মুহূর্তে প্রকাশ করলে ঝড়ের বেগে বইটি উড়ে যাবে, বলে ইবলিশের আত্মদর্শনের দ্বিতীয় সংস্করণটি এক প্রকাশককে দিয়ে উনি বইটি বের করেন। প্রকাশক ছিল তিনসঙ্গী প্রকাশনী।
তাঁরা প্রকাশনীর ক্যাপশনে লিখেছিলেন— লেখক, পাঠক এবং প্রকাশক। এই নিয়ে তিন সঙ্গী। আসলে এই প্রকাশনীর কর্ণধার ছিলেন তিন জন। তাই নাম হয়েছিল তিনসঙ্গী।
সেই তিন জনের একজন ছিলেন ‘কুবেরের বিষয়আশয়’-খ্যাত জনপ্রিয় লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জামাই। তিনিও কবিতা লিখতেন।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আনন্দবাজার গোষ্ঠীর ‘দেশ’ পত্রিকার সমন্তরাল যুগান্তর গোষ্ঠীর মূল ধারার সাহিত্য সাপ্তাহিকী ‘অমৃত’ পত্রিকার সম্পাদনার পাশাপাশি জমির ব্যবসাও করছেন।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার চম্পাহাটি রেল স্টেশন লাগোয়া এক লপ্তে বিস্তীর্ণ এলাকা কিনে চার কাঠা ছ’কাঠা করে প্লট তৈরি করে একের পর এক প্লট বিক্রি করছেন সাগরময় ঘোষ, সন্তোষকুমার ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, রমাপদ চৌধুরীর কাছে।
বাবার সূত্র ধরে সেই সময়কার সমস্ত প্রথিতযশা কবি-লেখক, সম্পাদকদের কাছে যাবার অবারিত দ্বার ছিল এই শান্তনু দাসের।
সেই শান্তনু দাস হঠাৎ করে এমন একটা জায়গায় আমাকে নিয়ে এলেন কেন? তা হলে ইনিও কি লেখালিখির লোক?
ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে সিঁড়ি হাতরে হাতরে আমরা দু’জনে যখন দোতালায় গিয়ে উঠলাম, শুনলাম এখনও এখানে বিদ্যুৎ এসে পৌঁছয়নি। তবে খুব তাড়াতাড়িই আসবে। খুঁটি পোঁতাটোতা হয়ে গেছে।
সকালে এই হারুদার বাড়ির সামনে থেকে নাকি একটা বাস ছাড়ে। সেই বাসে করেই ওখানকার লোকেরা কলকাতায় যায় চাকরি করতে। সেই বাসটাই আবার সন্ধ্যেবেলায় ফিরে আসে। হারুদা সেই বাসে করেই গোপালনগরের কাছে আলিপুর থানার গা-লাগোয়া ডি ভি সি-তে যান। তিনি তখন ওখানে চাকরি করতেন।
তো, আমাদের ওই সময় দেখে যেন ভূত দেখলেন হারুদা। বৌদি আমাদের চা-টা খাওয়ালেন। এবং দু্’জনেই তাড়া লাগাতে লাগলেন যাতে আমরা ওখান থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ি।
শান্তনুদা বলল, এখনও তো সাতটা বাজেনি। আর একটু থাকি?
ওঁরা বললেন, সা… ত…টা!
এমন ভাবে ‘সা… ত…টা!’ উচ্চারণ করলেন যেন রাত দুটো বেজে গেছে।
তার পরেই বললেন, সে কী! তা হলে তো এখান থেকে যাওয়া খুব মুশকিল। মনে হয় না ফেরার কিছু পাবে।
আমি বলছি, আজ থেকে বিয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কথা।
শান্তনুদা যে পত্রিকাটি করতেন, সেই ‘গঙ্গোত্রী’ পত্রিকাটি ছিল মূলত কবিতা এবং কবিতা বিষয়ক গদ্যের পত্রিকা।
সে দিনই ওদের দু’জনের আলোচনা থেকে জানতে পারলাম, যেহেতু হারুদা কবিতার ধারকাছ দিয়েও যান না, গদ্য লেখেন, তাই পরের সংখ্যা থেকে গঙ্গোত্রীর সঙ্গে গদ্যের একটা অংশ যুক্ত হবে। তার নাম— জটায়ু।
যেহেতু জটায়ু বিভাগটির যাবতীয় খরচ বহন করতেন হারুদা এবং ডি ভি সি এবং শ-ওয়ালেসের বিজ্ঞাপন জোগাড় করে দিতেন, তাই ওই বিভাগটির সম্পাদক ছিলেন হারুদা ওরফে অর্ধেন্দু চক্রবর্তী।
আর শান্তনুদার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধবেন, অথচ কবিতা লিখবেন না, এটা তো হতে পারে না। অর্ধেন্দু চক্রবর্তী গদ্যের পাশাপাশি লেখা শুরু করলেন কবিতাও।
সেই লেখাগুলোকে কাটাছেঁড়া করে, সংশোধন সংযোজন এবং পরিমার্জন করে ছাপার যোগ্য করে দিতেন শান্তনু দাস।
সেই শান্তনু দাসই তাঁকে প্রেসক্রাইব করে দিয়েছিলেন কবিতা লিখতে গেলে তাঁর কোন কোন কবিতার বই পড়া উচিত।
শান্তনু দাসের ‘কাফের’ এবং পবিত্র মুখোপাধ্যাযয়ের ‘ইবলিশের আত্মদর্শন’ তাঁকে এতটাই মোহিত করেছিল যে, সেই অর্ধেন্দুদা লিখে ফেললেন ওই দুটি দীর্ঘ কবিতার অনুকরণে— প্রসঙ্গ অর্জুন।
না, অর্ধেন্দুদার সঙ্গে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠলেও, আমার কিন্তু কখনওই তাঁকে খুব বড় মাপের তো নয়ই, মাঝারি মাপেরও নয়, অতি ছাপোষা কোনও কবি বা লেখক বলেও মনে হয়নি। এমনকী আমার কাছে খুব ভাল জাতের অনুবাদকও হয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
তাই উনি যখন তাঁর ‘আবর্ত’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে আমাকে দায়িত্বভার নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন, সেই অনুরোধ আমি অনায়াসে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।
এই নভেম্বর মাসে মাত্র পাঁচ দিনের তফাতে তাঁর জন্ম এবং মৃত্যু দিবসে যখন অনেকেই তাঁকে নিয়ে নানান গালভরা কথা লিখছেন, তখন আমার মনে হল, এই অবসরে এই সত্যটুকু জানানো খুব দরকার।
আসলে কেউ মারা গেলেই, অনেকেই আছেন যাঁরা তাঁকে নিয়ে নাচানাচি শুরু করে দেন। অযোগ্য হলেও প্রমান করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন, উনি কত বড় মাপের কবি, লেখক বা মানুষ।
তাঁরা একবারও বোঝার চেষ্টা করেন না, অযোগ্য লোককে জোর করে বা কায়দা করে সামনের সারিতে নিয়ে আসা মানে যোগ্য লোককে পিছনের সারিতে ঠেলে দেওয়া। তাঁদের অপমান করা। ছোট করা। একজন সামান্য অক্ষরকর্মী হিসেবে আমি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারব না।
সহ্য করতে পারব না ভুলভাল লোককে নিয়ে, সাহিত্যের সঙ্গে যাঁদের সামান্যতমও কোনও যোগাযোগ নেই, শিল্প-সাহিত্যের সামান্য কোনও বোধও নেই, জানেন না বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, সেই সব উল্টোপাল্টা লোকেদের এই নাচানাচি।
যাঁরা মনে করেন, কেউ মারা গেলেই তাঁকে মহান করার ব্রত নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে, আমি মোটেও সেই দলের নই। আমি ইতিহাসকে বিকৃত করতে পারব না। সাদাকে সাদা এবং কালোকে আমি কালো বলবই।
তাতে যদি কিছু অযোগ্য, ব্যর্থ এবং অপদার্থ লোক রে রে করে তেড়ে আসেন, না হয় আসবেন। কী করব! তা বলে সত্য থেকে আমি বিচ্যুত হতে পারব না। তাই উনি আর সবার কাছে অর্ধেন্দু চক্রবর্তী হলেও, উনি কিন্তু আমার কাছে সেই হারুদাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here