বেঙ্গল ওয়াচের সাহিত্যের পাতা # ২৯ নভেম্বর # ত্রয়োদশ সংখ্যা # গল্প # কালিন্দী # রিংকি নন্দী (শাশ্বতী)

0
29
।।।।।।।।।গল্প।।।।।।।।।।।।।
কালিন্দী
রিংকি নন্দী (শাশ্বতী)।।।।।।।।।।।।।
সে অনেক অনেক দিন আগের কথা।
আজ সকাল থেকেই শ্যামা খুব চিন্তিত।
একবার ঘর একবার দালান দৌড়ে বেড়াচ্ছে সে। কালিন্দী সন্তান সম্ভবা। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে সে আর তা দেখেই যন্ত্রণার অভিব্যক্তি স্পষ্টতই দৃশ্যমান শ্যামার দু’চোখের তারায়।
দিদু আমি এখুনি আসছি বলেই এক ছুটে বেরিয়ে গেল সে ঘরের বাইরে। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এল ধাইমাকে সঙ্গে নিয়ে। বুড়ি ধাইমা এসে কাঁচুমাঁচু মুখে শ্যামার কীর্তি বৰ্ণনা করে তার দিদার কাছে।
নাতনির কাণ্ড দেখে শশীকলাদেবী হেসেই অস্থির।
ওরে মুখপুড়ি এ কি করেছিস তুই, কালিন্দীর জন্যে এ কাকে ধরে এনেছিস তুই, হাসতে হাসতে শশীকলাদেবী জানতে চান নাতনির কাছে। অবাক চোখে বছর পনেরোর নাতনি শ্যামা বলে ওঠে কেন আমার কালিন্দীর তো বাচ্ছা হবে তাই তো ধাইমাকে দেখে এনেছি। ধাইমাকে হাতের ইশারায় যেতে বলে শশীকলাদেবী শ্যামাকে বললেন, ওরে মানুষের বাচ্ছা হওয়ার সময় ধাইমার দরকার লাগে। দিদার কথায় রাগে লাল হয়ে ওঠে শ্যামা, তার মানে তুমি কি বলতে চাইছ কষ্ট কি শুধু মানুষেরই হয়, ওদের হয় না? নাতনির সঙ্গে দিদার তুমুল লড়াই শুরু হয়ে যেত যদি না সেই মক্ষম সময়ে কালিন্দীর সন্তানরা ভূমিষ্ঠ না হত।
শ্যামার জন্ম দিয়েই তার মা-টা যেই না চোখ বুজল ওমনি শ্যামার ঠাকুমা নাতনিকে তার দিদার বাড়ি ফেলে রেখে দিয়ে ছেলের আবার বিয়ে দিল নাতির মুখ দেখার জন্যে। সেই ছোট্ট বেলা থেকেই তাই শ্যামা তার দিদার কাছে মানুষ। এক সময় দিদার গোয়াল ছিল, সেখানে ছিল শ্যামলী। ওই শ্যামলীই হয়ে উঠেছিল শ্যামার খেলার সাথী। বয়স বাড়তে লাগল দুজনেই। একদিন কালের নিয়মেই শ্যামলী চোখ বুজল। ধরে রাখা যায়নি শ্যামাকে। নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করেছিল সে। অসুস্থ হয়ে পড়ছিল দিন দিন মেয়েটা। এ দিকে বয়স বাড়ছিল শশীকলাদেবীরও। আর নতুন করে গরু পোষা সম্ভবপর হবে না ভেবেই প্রতিবেশীদের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি কিনে আনলেন কালিন্দীকে। ও আসার পর থেকেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে থাকে শ্যামা।
সারাদিন সে কালিন্দীকে নিয়েই মেতে থাকত।তাকে নিয়ে সে গোটা গ্রাম ঘুরে বেড়াত। যেন তার সই হয় কালিন্দী। কতই না বকবক করত সে তার সাথে দিনভর। নাতনির ছেলেমানুষি দেখে মনে মনে হাসতেন শশীকলাদেবী। আজ সেই কালিন্দী মা হতে চলেছে। তার কষ্টে যে শ্যামার বুক ফাটবেনা এ বলাই বাহুল্য।
কালিন্দীর চারটে ছানা হয়েছে। আদর করে শ্যামা তাদের নাম দিয়েছে কালু, ভুলু, নাড়ু, গজা।সারাদিন ধরে সে ব্যস্ত থাকে ওই চারটে সন্তানের দেখভাল করার জন্যে। সেই দেখে দিদা মুখ টিপে হেসে বলেন, মার চেয়ে মাসির দরদ বেশি। সে কথা কানেও নেয়না শ্যামা।
একটু বড় হতেই শ্যামা তার দলবল নিয়ে গ্রাম পরিভ্রমণ করতে বেরিয়ে পড়ল। সামনে শ্যামা পিছনে কালিন্দী আর তাদের মাঝে কালু, ভুলু, নাড়ু, গজা। পাড়ার লোকেরা হাঁ করে দেখত শ্যামার কীর্তিকলাপ সকাল বিকেল।
একদিন বিকেলে নিজেদের অভ্যাসমত প্রাত্যহিক নগর পরিভ্রমণে বেরিয়েছে শ্যামার দলবল এমন সময় ওই পথেই বাড়ি ফিরছিলেন ওই গ্রামের পুরুতের মশাই সনাতন চক্রবর্তী তাঁর দলবল নিয়ে।নাদুসনুদুস চারটে কচি ছাগলছানা দেখে সুড়ুৎ করে জিভের লালটা টেনে নিয়ে বললেন, ও শ্যামা তোর ওই চারটে ছাগল ছানার দুটোকে দিবি আমায়। কত দাম নিবি বলিস দেব। খুব কচি তুলতুলে খেতে হবে ওদের মাংস। কত দিন যে এমন কচি মাংস খাইনি। এই বলে জিবটা আবার সুড়ুৎ করে টেনে নিলেন তিনি।
যেইনা সনাতন পুরোহিত এ কথা বলেছে ওমনি শ্যামা তার রুদ্র মূর্তি ধরল। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটা অধলা ইট নিয়ে ছুড়ে মারল সে সনাতনের কপাল লক্ষ্য করে। ভাগ্যিস সরে গিয়েছিল সনাতন নাহলেই একটা রক্তারক্তি কাণ্ড বেঁধে যেত। কি বললে তুমি, তুমি আমার কালিন্দীর ছানাদের ক্ষতি করার চিন্তা করছ! আমি বেঁচে থাকতে তুমি ওদের গায়ে হাত দিতে পারবে না। হাত দিলে ওই হাত আমি কেটে নেব এই বলে দিচ্ছি। হাতে আর একটা ইট তুলে নেয় শ্যামা সনাতনকে পুনরায় প্রহারের উদ্দেশ্যে। প্রাণ ভয়ে সেই সময়ের মতো সেখান থেকে পলায়ন করলেও এর প্রতিশোধ তিনি নেবেন অবশ্যই শ্যামার উপর, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন সনাতন পুরোহিত।
একদিন ভোর রাতে কালিন্দীকে খুব চিৎকার করে ডাকতে শুনল শ্যামা। বিছানা ছেড়ে উঠে ঘরের বাইরে আসতে গিয়ে সে বেশ বুঝল বাইরে থেকে কেউ শিকল তুলে দিয়েছে তাদের দোরের। দিদা, ও দিদা, দেখো কেউ আমাদের ঘরে আটকে দিয়ে আমার কালিন্দীর ক্ষতি করতে এসেছে। আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে দরজা খোলার ব্যর্থ চেষ্টা করতে থাকে শ্যামা।
পর দিন সকালে শ্যামার চিৎকারে পাড়া প্রতিবেশীরা যখন শিকল খুলল তখন এক ছুটে ঘরের বাইরে এসে শ্যামা দৌড়ে গেল কালিন্দীর কাছে। সে যা সন্দেহ করেছিল ঠিক তাই, নাড়ু আর গজা নেই। কালিন্দীর চোখে জল। ব্যা ব্যা করে সে বার বার শ্যামার দিকে তাকিয়ে তার সন্তানদের ফিরে পাওয়ার জন্য আকুতি জানাতে লাগল।
এক ছুটে সে ঘরের বাইরে বেরিয়ে গেল কোথায় যাচ্ছে কাউকে কিছু না বলে। ওরে শ্যামা, কোথায় যাচ্ছিস, চিৎকার করে পিছু ডাকেন শশীকলাদেবী তার নাতনিকে। সে কথা কানেও ঢোকে না শ্যামার।মনে মনে প্রমাদ গুনলেন তিনি।
সূর্য তখন মাথার উপর চড়েছে, কোনও খোঁজ নেই নাতনির। দাওয়ায় চিন্তিত মুখে বসে আছেন শশীকলাদেবী। হঠাৎ হাবু এসে খবর দিল, শ্যামার আদরের নাড়ু আর গজাকে নাকি লোক দিয়ে চুরি করিয়েছিলেন সনাতন পুরোহিত আর আজ এই গাঁয়ের জমিদার মশাইয়ের নাতির জন্ম উপলক্ষ্যে এক বিরাট পুজোর আয়োজন করা হয়েছে জমিদার মশাইয়ের বাড়ি। ওখানেই নাকি ওদের বলি দেওয়ার কথা। সেই মাংস নাকি ব্রাহ্মণকে দিলেই জমিদার মশাইয়ের নাতি দীর্ঘায়ু হবে, এই নিদান নাকি জমিদার মশাইকে স্বয়ং সনাতন পুরোহিতই দিয়েছেন। ওনাদের বাড়ির কুলো পুরোহিত কিনা উনি।
কথাখানি শুনে চমকে ওঠেন শশীকলাদেবী।জানতে চান এই খবর কি শ্যামার কানে গেছে।হাবু, জানায় রাস্তায় নাকি শ্যামার সঙ্গে দেখা হতে সেই এই কথা জানিয়েছে। যারা কাল রাতে ছাগল চুরি করতে এসেছিল তাদের একটাকে ধরে ফেলেছে শ্যামা, তাকে উত্তম মধ্যম দিতেই সবটা জানতে পেরেছে সে। সে নাড়ু আর গজাকে বাঁচাতে জমিদার বাড়ির দিকে দৌড়েছে।
এ পর্যন্ত শুনেই শশীকলাদেবীর হৃদকম্পন বন্ধ হওয়ার জোগাড়। শেষে যদি জমিদার বাড়ির পুজোয় বাঁধা পড়ে তা হলে এই গ্রাম থেকে তাদের বাস উঠতে বাধ্য। পড়ি কি মরি করে দৌড়ালেন শশীকলাদেবী শ্যামাকে বিরত করতে।
যখন তিনি সেখানে পৌঁছলেন তখন পূজো নির্বিঘ্নেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু শ্যামা কোথায়।বলির রক্তও পরিষ্কার করে ফেলেছে সকলে, দূরেই পড়ে আছে নাড়ু আর গজার প্রাণহীন শরীর দুটি।সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে চোখ মুছলেন শশীকলাদেবী। কিন্তু কোথায় তার নাতনি শ্যামা।চিন্তিত মুখে বাড়ি ফিরে এলেন তিনি।
গ্রামের একপ্রান্তে থাকা এই জাগ্রত কালী মন্দিরের ফাঁকা চাতালে বসে, প্রদীপের আলোয় প্রজ্জ্বলিত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে শ্যামা। বুক ভরা তার অভিমান। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলে ওঠে, তুই কেমন মা। তোর এক সন্তান তোর অপর অবলা সন্তানকে তোরই সামনে অন্যায় ভাবে বলি দিল আর তুই চুপ করে দেখলি!এ তোর কেমন বিচার মা, কেমন বিচার এ তোর?
কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল শ্যামা, মায়ের মন্দিরের চাতালেই সে বুঝতে পারেনি।আচমকাই তার ঘুম ভাঙল একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। চোখ মেলে তাকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবতে থাকে শ্যামা তার দেখা স্বপ্নটিকে নিয়ে। তারপরই তার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা খেলে যায়। মা কালীর দিকে ফিরে জোড় হাত কপালে ঠেকিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ায় সে।
রাত তখন কত হবে জানা নেই। বৃদ্ধ বিপত্নীক জমিদার রামতনুবাবু ঘুমে অসাড়।
রামতনু,বাবা রামতনু…
নারী কন্ঠে নিজের নাম শুনে বিছানায় ধড়মড় করে উঠে বসলেন তিনি। কিন্তু একি দেখছেন তিনি।প্রদীপের আলোয় তিনি পরিষ্কার দেখতে পেলেন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁদের কুলদেবী স্বয়ং মাকালী। দু’চোখে তাঁর অশ্রুধারা।
একি মা তুমি কাঁদছ কেন? জোড় হাত করে জানতে চান রামতনুবাবু। মা কালী কাঁদতে কাঁদতে তাকে বলেন,বাবা এত কাল তোর বাড়ি আছি কিন্তু তুই আমায় কোনও দিনও এত ব্যথা দিস না, যা তুই কাল আমায় দিলি। তাই আমি তোর বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এই কথা শুনে আতঁকে উঠলেন বৃদ্ধ রামতনুবাবু।মাগো কি ভুল করেছি আমি, যার জন্য তুমি আমায় ছেড়ে চলে যেতে চাও? জানতে চান তিনি।মা কালী বলেন, তুই কেন ওই দুটি অবলা প্রাণীকে আমার সামনে বলি দিলি? কেন বুঝিস না ওরাও তো আমারই সন্তান। মা হয়ে সন্তানের রক্ত আমি সইব কী ভাবে? তোর সন্তান যেমন তোর কাছে প্রিয় তেমন তুই যাদের বলি দিলি তারাও তো কারো সন্তান, সেই মায়ের চোখের জল আমি সহ্য করি কী ভাবে বল। তোর নাতির মঙ্গল কামনায় তুই ওই অবলা প্রাণীগুলোর অমঙ্গল করিস কিভাবে? মানুষ বলে কি তোর এই অধিকার আছে যাকে খুশি তুই হত্যা করবি? মা কালীর দু’চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে। বিছানা থেকে নেমে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইতে উদ্দত হলেন জমিদারমশাই। মা কালী কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন। মাগো ক্ষমা করো আমায়। আর এমন ভুল জীবনে হবে না। এমনকী আমার গ্রামে কাল থেকেই আমি পশুবলি নিষিদ্ধ করব। মাগো আমি কথা দিচ্ছি তোমায়। মাগো তুমি আমাদের বাড়ি ছেড়ে দয়া করে যেও না। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন জমিদার মশাই।
সকালবেলা জমিদারের পেয়াদারা এসে গ্রামের পথে পথে শুনিয়ে দিয়ে গেলেন মাকালীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে জমিদার মশাই এই গ্রামে সকল পূজায় পশুবলি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।
আর সেই শুনেই কালিন্দীকে জড়িয়ে ধরে শ্যামা কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে আমি পেরেছি, আমি পেরেছি পশুবলি বন্ধ করতে। ব্যা ব্যা করতে করতে দু’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে কালিন্দীর চোখের পাতা বেয়ে, যেন ওই মূক প্রাণীটি বলতে চায়, সবই হল কিন্তু বড় দেরি হয়ে গেল। আমার সন্তানরা তো আর কোনও দিনই আমার কোলে ফিরে আসবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here