বাজারে আলু সবজির দামে আগুন লেগেছে # চাষি কিন্তু দাম পাচ্ছেন না # ফল ভুগবেন দিদিমণি # ফেসবুকে লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রসূন আচার্য

0
48

বাজারে আলু সব্জির দামে আগুন লেগেছে, চাষি কিন্তু দাম পাচ্ছেন না। ফল ভুগবেন দিদিমণি

——–প্রসূন আচার্য

বলুন তো আলুর দাম কত?

একশ জনকে জিজ্ঞাসা করুন।

নিরানব্বই জনই উত্তর দেবেন।

বলবেন ৪০/৪২ টাকা কেজি।

বলুন তো পশ্চিমবঙ্গের কৃষি মন্ত্রীর নাম কি?

একশ জনের মধ্যে আটানোব্বই জনই বলতে পারবেন না।

অনেকেই কোনও দিন তাঁর নামই শোনেননি।

তিনি হলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরভূমের লোক।

এটা শুনেই অনেকে বলবেন, ওহ এবার মনে পড়েছে। ওই ক’দিন আগে তৃণমূলের মঞ্চে সকলের সামনেই অনুব্রত মণ্ডল যাঁকে ধমকাচ্ছিল আর পা নাচিয়ে বলছিল, “আপনি মশাই একদম ফালতু লোক! চুপ করে থাকুন!”

জানিয়ে রাখি, আশিসবাবু কিন্তু মোটেই ফালতু লোক নন। অত্যন্ত সুভদ্র, শিক্ষিত, শিক্ষক এবং পিএইচডি করা ।

তৃণমূলে এমন মানুষ কিঞ্চিত কমই আছেন। মন্ত্রী হওয়ার আগে, বিধানসভার অধিবেশন চলাকালীন তিনি এমএলএ হস্টেলে ফিরতেন সরকারি বাস বা ট্যাক্সিতে।

এমনকি কাঁধে কাপড়ের ঝোলা ব্যাগটা নিয়ে আমি তাঁকে প্রাইভেট বাসেও উঠতে দেখেছি!

যা কলকাতা তো বটেই বরানগর, দমদম বা ব্যারাকপুরের কোনও একবারের কাউন্সিলরও কল্পনা করতে পারবেন না।

তাঁরা দুধ সাদা স্কর্পিও চড়ে ঘোরেন।

কিন্তু আলু ৪২, উচ্ছে, ঝিঙে, পটল, ঢেঁড়স ৭০ টাকা, কাঁচা লঙ্কা ১৫০টাকা কেজি কেন? চাষি কি এত দাম পাচ্ছে?

তার উত্তর আশিসবাবুর কাছে নেই।

যেমন হুগলিতে হিমঘরে এত আলু, চাষি তো ৪ টাকা কেজিতে ছেড়ে ছিল, কিন্তু দাম কমেছে না কেন?

সেই উত্তর সিঙ্গুরের তৃণমূল বিধায়ক, মাস্টার মশাই রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এর কাছে নেই।

উনিও এক সময়ে তৃণমূলের কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। পরে অবশ্য তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বাংলার আলু ভাণ্ডার হুগলি আর পূর্ব বর্ধমানের হিমঘরে আলু থাকা সত্ত্বেও কেন তা বাজারে বার করে দাম কমানো হচ্ছে না?

এর উত্তর ভাইপো ঘনিষ্ঠ হুগলি জেলার তৃণমূল প্রধান কাউন্সিলর দিলীপ যাদব জানেন।

প্রাক্তন সাংবাদিক, আমার একদা সহকর্মী প্রবীর ঘোষাল থেকে আরম্ভ করে এই জেলারই বিধায়ক প্রাক্তন কৃষি বিপণন মন্ত্রী তপন দাশগুপ্ত-সহ ১৩ জন তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ যাদবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন।

কিন্তু তাঁকে পদ থেকে সরানো যাচ্ছে না!

আবার দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য বহু ঢাক ঢোল পিটিয়ে তৈরি করা টাস্ক ফোর্সের অভিযানও তেমন কোথাও হচ্ছে না!

এক মাস আগে আলু যখন ৩৫ টাকা কেজি ছিল, এই হুগলি জেলারই বিধায়ক বাংলার বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান সাহেব মুখমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছে আবেদন করেছিলেন, আলুর দর নিয়ন্ত্রণে কমিটি তৈরি হোক। হিমঘরে, মজুতদারদের আড়তে হানা হোক। তিনি সম্পূর্ণ সাহায্য করবেন।

কে শোনে কার কথা। কাকস্য পরিবেদনা। লক্ষীপুজোর পর আলু যে ৪০ ছাড়ালো, আর নামছে না! ওদিকে কেন্দ্র বিদেশে রফতানি বন্ধ করার পরেও পিয়াঁজ ৮০  টাকা! তাও কমছে না। তা নিয়ে আবার মমতা চিঠি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদিকে। কিন্তু সেই চিঠিতে পেঁয়াজের পাশাপাশি আলুর কথাও বলা হয়েছে। যা রাজ্যের হাতে!

এমন যদি হতো, সব্জির দাম বেশির কারণ চাষের খরচ হটাৎ করে বেড়েছে। আর চাষিরাও আগের থেকে অনেক বেশি লাভ করেছে। তা হলে হয় কথা ছিল।

কিন্তু যে কোনো গ্রামে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, তাঁদের আয় কিছুই বাড়েনি। লাভের গুড় খাচ্ছে ফোড়ে, আড়তদার এর তৃণমূলের কিছু নেতা-কর্মী। সামনে ভোট। লড়তে অনেক, অনেক টাকা লাগবে। সুতরাং টাকা কোথায় যাচ্ছে সহজেই অনুমেয়!

রাজ্য সরকারের ওয়েবসাইট বলছে পশ্চিমবঙ্গে ৭২ লাখ কৃষি পরিবার। এবং তার মধ্যে ৯৬ শতাংশই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। যাঁদের জমির পরিমান খুবই কম। মাথা পিছু গড়ে ০.৭৭ হেক্টর। তাঁরা বছরে এক বা দুই বার ধান চাষ করেন। বাকি সময় অনাজ ও সব্জী। ৭২ লাখ পরিবার মনে চার কোটি মানুষ। মাথায় রাখতে হবে।

ভূমি সংস্কারের পর এই কৃষকরা বছরের পর বছর সিপিএম ও অন্য বাম দলের সঙ্গে ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের পর প্রথমে সিঙ্গুর ও পরে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় থেকেই তাঁরা তৃণমূলমুখী। ২০০৯, ২০১১, ২০১৪, ২০১৬ টানা ভোট দেওয়ার পরে ২০১৮ থেকে ব্রেক লেগেছে। অনেকেই বিজেপি মুখী। বিজেপির ১৮ টি লোকসভা আসন জেতার কারণও সেটাই।

একে তো চাষির লাভের গুড় সবুজ পিঁপড়ে খাচ্ছে। তার উপর মোদি-অমিত শাহ-দিলীপ ঘোষ থেকে তামাম বিজেপি নেতারা একটানা বলেই যাচ্ছেন, লক ডাউনের জন্য দেশের সব জায়গায় চাষিরা ৬ হাজার টাকা কেন্দ্রীয় সাহায্য পাচ্ছেন। সেইসঙ্গে আউষসমান ভারত স্কিমে বিনা পয়সায় চিকিৎসা। কিন্তু দিদি বাধা দেওয়ায় এই রাজ্যের চাষিরা কিছুই পাচ্ছে না। এমনকি ধানের দামও অন্য রাজ্য থেকে কম পাচ্ছে।

সিপিএমের ভোট ৭% হলেও বিভিন্ন জেলায় তাঁদের কৃষক সংগঠন আছে।

তাঁরাও নিয়মিত সরকার বিরোধী মিটিং ও জমায়েত করছেন। চাষিরা সে কথা শুনছেন।

আমফনের ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে তৃণমূলের পঞ্চায়েত ও জেলার নেতারা যে দুর্নীতি করেছেন, তার ঘা এখনও গরিব চাষিকে বিঁধেছে। সুন্দরবন-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ন এলাকায় বর্ষার পরেই সব্জী চাষ হয়। কিন্তু আমফনের পর এখনও সেখানে মাটিতে নুন বেশি। চাষ হচ্ছে না।

তৃণমূল আমলে উত্তরবঙ্গের কপি, মুলো, টমাটো থেকে আরম্ভ করে বিভিন্ন সব্জী প্রতিদিন আট ঘন্টার মধ্যে দক্ষিণে, বিশেষ করে বৃহত্তর কলকাতার বাজারে আসবে সেটাই সবাই ভেবেছিল। কিন্তু সাড়ে নয় বছরেও তা হলো না। সেই পরিকাঠামোই গড়ে উঠলো না।

শুধুই রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, গৌতম দেব এর বিভিন্ন কার্যকলাপ খবরের শিরোনাম হয়।

মাঝখান থেকে বাম আমলে মন্ত্রী-সান্ত্রী হয়ে সব সুযোগ গুছিয়ে নেওয়া উদয়ন গুহ, পরেশ অধিকারীদের দলে নেওয়ার পরে রোজই ঝগড়া, বিবাদ।

কৃষি উন্নয়ন ও বিক্রি নিয়ে ভাববে কে ?

মমতা দাবি করেছেন, বাম আমলে ২০১০ সালে নাকি কৃষকদের বছরে রোজগার ছিল ৯১ হাজার টাকা। আর তৃণমূলের নয় বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার টাকা।

উনি এই তথ্য কোথায় পেয়েছেন কে জানে!

নিশ্চয়ই কোনও সরকারি আধিকারিক মাননীয়াকে খুশি করতে এই তথ্যে দিয়েছে। বাস্তবের সঙ্গে কিন্তু মিলছে না!

মোদ্দা কথা কৃষকদের হাতে টাকা নেই। মধ্যবিত্ত গরিব মানুষ দুই কেজি আলু, একটু পেঁয়াজ, লঙ্কা, অনাজ কিনতে গিয়ে চোখের জল ফেলছেন। প্রতিদিন। এর ফল যে ভালো হবে না, তার জন্য বড় কোনও অর্থিনীতি বোদ্ধা বা সমাজতত্ত্ববিদ হওয়ার দরকার নেই।

হাতে আর বেশি সময় নেই দিদিমণি। পিকে নয়। বাঁচালে মানুষই বাঁচাবে। এখনও দেখুন।

C@Prasun Acharya, ছবি: সংগৃহীত।

Plz like and share.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here