বাইডেন রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন # সামাজিক সুস্থিরতা ফিরবে আমেরিকায় # স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন কালো-বাদামি মানুষ, সংখ্যালঘুরা # বিশ্বও বাঁচবে হাঁফ ছেড়ে, লাগাম পড়বে পরিবেশ দূষ # ফেসবুকে লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রসূন আচার্য

0
103

বাইডেন রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। সামাজিক সুস্থিরতা ফিরবে আমেরিকায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন কালো, বাদামি মানুষ, সংখ্যালঘুরা। বিশ্বও বাঁচবে হাঁফ ছেড়ে, লাগাম পড়বে পরিবেশ দূষণ

———প্রসূন আচার্য

নতুন বছরে সাদা বাড়িটার বাসিন্দা কে হবেন, সেই দিকে গোটা বিশ্ব তাকিয়ে।

এবং জো বাইডেন অনেকটাই নিশ্চিত।

এই সুযোগে এক যুগ আগে ওই বাড়ির সামনে তোলা আমার ছবিটা পোস্ট করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

লেখার হেডিং-এ যে স্বস্তির কথা বললাম, তা আসলে কী পদে পদে টের পেয়েছিলাম জুনিয়র বুশের আমলে মার্কিন মুলুকে গিয়ে।

আমেরিকা যাওয়া এখন বাঙালির কাছে জল ভাত।

পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই বাংলাদেশের বাদামি মানুষ এখন আমেরিকায় ভর্তি।

আমার চেনা পরিচিত, সাংবাদিক পেশার সঙ্গে যুক্ত বা আমার পরিবেশ আন্দোলনের যে সব সহকর্মী আছেন, তাঁদের অনেকেরই পুত্র-কন্যারা ও দেশে থাকেন।

সুতরাং নতুন করে বলার খুব বেশি নেই।

তবু যেহেতু বাইডেন এর জয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, আর টিভি খুললেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের নরেন্দ্র দামোদর ভাই মোদির বড়-ভাই ডোনাল্ড ট্রাম্প আট-ভাট মিথ্যে কথা বলে আর রিগিং এর মিথ্যে অভিযোগ তুলে আমেরিকার নাম ডোবাচ্ছেন, (সিএনএন, ভয়েস অফ আমেরিকা সহ বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা ঠিক এই কথাটাই বলছেন) তাই আমি ভাবলাম, নিজের অভিজ্ঞতার দু’কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করি।

২০০৬ সালে কলকাতার মার্কিন তথ্য কেন্দ্রের সহায়তায় আমি প্রিন্ট মিডিয়া জার্নালিজিম এর একটা ছোট কোর্স করতে মাসাধিকের জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলাম।

ভারত থেকে আমি একাই।

এশিয়া থেকে পাকিস্থান, আফগানিস্তান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ওমান, ইয়েমেন ও ইজরাইলের সাংবাদিক ছিলেন।

আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ মিলিয়ে সাদা কালো আর ব্রাউন (আমি ব্রাউন এর দলে) প্রায় জনা কুড়ি। সকলেই রাজনৈতিক সংবাদদাতা।

আমেরিকা যাওয়ার আগে আমি জানতাম না, আমি সাদার নিচে, আর কালোদের উপরে, বাদামির দলে। ক’দিন আগে, এই ২০২০তে আমরা প্রথমে আমেরিকা, পরে গোটা বিশ্বে ‘ব্ল্যাক লাইফ মেটার্স’ আন্দোলন দেখেছি। সাদা চামড়ার সঙ্গে কালো চামড়ার কী ভয়ঙ্কর বিভেদ তা আমেরিকায় গিয়ে বুঝেছিলাম। হিন্দু-মুসলিমের থেকেও বেশি।

আমাদের দলটি যাঁরা গাইড করতেন, অর্থাৎ কোথায় কী ক্লাস আছে, কোন কাগজের অফিসে যাওয়া হবে, কোন কাগজের সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করে তাদের এডিটোরিয়াল পলিসি নিয়ে আলোচনা হবে (এই সূত্রেই আমি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ইকোনমিস্ট এর অফিসে গিয়েছিলাম), তাঁদের মধ্যে একজন মহিলা ও দু’জন পুরুষ। তিন জনই আমেরিকার নাগরিক। যিনি সাদা ভদ্রলোক তাঁর নাম বিল।আর যিনি কালো, তাঁর নাম গ্লেন। সব সময় দেখতাম বিল গলা চড়িয়ে গ্লেনকে নির্দেশ দিচ্ছেন। এবং গ্লেন তা পালন করেছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ব্যাগও বহন করতেন। গাড়িও বুকিং করতেন। আরও অনেক ফাইফরমাস কাজ। বিল প্রায় কিছুই করতেন না। শুধু আমাদের দলে সাদা চামড়ার তিন মহিলা সাংবাদিক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এক জন ইহুদি, তাঁদের খুব তোয়াজ করতেন।

প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে দুই সপ্তাহ কাটল। নিউ ইয়র্কের হোটেলে একদিন উইক-এন্ডে গ্লেনকে আমার ঘরে মদ খেতে আমন্ত্রণ জানালাম। সঙ্গে মরিশাস এর ফরাসি কাগজের সাংবাদিক হরিশ চন্দন সিংহ। বলে রাখি, বিহার থেকে ১৭০ বছর আগে হরিশের পূর্ব পুরুষ মরিশাস গিয়েছিলেন। হরিশ হিন্দিতে কথা বলতে পারেন।

২০১৬সালে তিনি কলকাতার দুর্গা পুজো দেখতে আমার বাড়িতেও এসেছেন। যাই হোক, দু পেগ খাওয়ার পর গ্লেন কেঁদে ফেললেন। বললেন, কালো বলে কি ভাবে পদে পদে বিল তাঁকে অসম্মান করছেন।

কিন্তু মাঝপথে তিনি এই কাজটি ছেড়ে চলেও যেতে পারছেন না!

মনে রাখবেন, তখন ট্রাম্পের মত আর এক রিপাবলিকান জর্জ বুশের জমানা।

যদিও এতটা খারাপ অবস্থা নয়। এবার শুনুন, গ্লেন কী বললেন। তিনি সারা জীবন আফ্রিকায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে অফিসারের কাজ করেছেন। অর্থাৎ সরকারি বিদেশ দফতরে। শেষ পর্যন্ত অবসর নিয়েছেন কোনো একটা দেশের ডেপুটি হাই কমিশনার হয়ে। কিন্তু তাঁর পরিবারে অনেক সদস্য। দায়িত্বও বেশি। পেনশনের টাকায় চলে না। তার জন্যই তাঁকে এই ধরনের কিছু কাজ করতে হয়। যেমন তিনি আমাদের গাইড করার কাজ করছেন।

আর বিল? ওর কোনও স্থায়ী কাজই নেই। বাড়ি টেক্সাস। একটা নাটকের দল করে। বেশি বয়সে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আর রিপাবলিকান পার্টি করেন। সেই সূত্রেই আমাদের মত কোন বিদেশি দল এলে জুটে যায় ট্যুর গাইড হিসেবে। ভালো টাকাও পাওয়া যায়।

আমি পাঠকদের বলছি, ভাবুন অবস্থাটা। শুধু গায়ের চামড়ায় রং এর জন্য একজন আরেক জনের উপর ছড়ি গোরাচ্ছেন। এটা আমার দেখা একটা আমেরিকা। হতে পারে খণ্ড চিত্র। কিন্তু সত্যি। পাশাপাশি বিরাট সংখ্যাক উদার গণতন্ত্রপ্রিয় সাদা মানুষও আমেরিকায় আছেন। তাই জনেই বাইডেন 50% এর বেশি ভোট পেয়েছেন।

আজ সকালেই সিএনবিসি দেখছিলাম। যে সব এবসেন্টি ভোটার এর ভোট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাঁদের সঙ্গে নির্বাচন দপ্তর যোগাযোগের পর, তাঁরা পরিচয় পত্র নিয়ে এসেছেন। দেখাতে হবে। দীর্ঘ লাইনেও দাঁড়াচ্ছেন। এমনই এক সাজুগুজু করা কালো মহিলাকে টিভি সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন। এই মহিলা থাকেন ১৬০০ কিলোমিটার দূরে টেক্সাস। আর পরিচয় পত্র নিয়ে দেখতে এসেছেন তাঁর ভোট কেন্দ্র লাস ভেগাসে। কাকে ভোট দিয়েছেন? একটু ইতস্তত করে বলেই ফেললেন, বাইডেন। তাঁর পর কেঁদে ফেললেন। বললেন, উনি ভগবান। উনি জিতলে আমরা কালোরা বাঁচব। না হলে মরে যাবো। এই চার বছর ট্রাম্প আর তাঁর সমর্থকরা আমাদের জীবনে অভিশাপ নামিয়ে এনেছিল। এখন বুঝছি, আমাদের এক একটা ভোট অত্যন্ত জরুরী। তাই এত খরচ করে, অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এত দূর এসেছি। যাতে ভোটটা গ্রাহ্য হয়।

প্রত্যেক মানুষের জীবনে রুটি রুজির পাশাপাশি সামাজিক সন্মানও সমান মূল্যবান। আজ আমাদের দেশে এত জাত ভিত্তিক দল, বিশেষ করে দলিত, পিচড়ে এমনকি মুসলিম দলের পিছনেও কারণ একটাই। বর্ণ হিন্দুদের হাতে সামাজিক অসম্মান থেকে মুক্তি চাই। সেই সঙ্গে রাষ্ট্র ক্ষমতার অংশীদারি।

ট্রাম্প বিদায়ের পরে বাইডেন ক্ষমতায় এলে সেই সন্মানটুকু অন্তত মিলবে বলে কালো থেকে আরম্ভ করে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের বাদামি মানুষরা মনে করছেন। অর্থাৎ যে আমেরিকা বড় মুখ করে সামাজিক সুস্থিরতা ও ন্যায়ের কথা, গণতন্ত্রের কথা বলে, তাঁরা পুনরায় বিশ্বকে সে কথা বলতে পারবেন। ক্ষমতার অংশীদার হবেন কালো-বাদামি জাত কমলা হ্যারিস।

কিন্তু তা বলে কি আমেরিকার বিদেশ নীতি খুব বেশি পরিবর্তন হবে? আমার মনে হয়না। কারণ, আমেরিকার একটাই নীতি। তুমি যদি আমেরিকার সঙ্গে থাক, সব ব্যাপারে এক মত হও, হোয়াইট হাউসের কথা শুনে চলো, তুমি ভাল। না হলেই খারাপ। এই নীতিতেই কমিউমিস্ট চিন-ভিয়েতনামও ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়! মার্কিন পুঁজি বিনিয়োগ হয় সেখানে।

আর কী হবে? ট্রাম্প পরিবেশ দূষণ, বিশ্ব উষ্ণঅন বলে কিছু মানতেন না। বেরিয়ে এসেছিলেন প্যারিস ক্লিয়মেট চুক্তি থেকে। যা নিয়ে ইউরোপের দেশ গুলির সঙ্গে মতবিরোধ হচ্ছিল আমেরিকার। আবার তা রূপায়িত হবে। বাইডেন ৪৭ বছর ধরে জনপ্রতিনিধি। সামান্য সেলস ম্যান ছিলেন তাঁর বাবা। সেখান থেকে বড় হয়েছেন। জীবনে অনেক শোক পেয়েছেন। বিয়ের ক’বছর বাদে প্রথম স্ত্রী দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। ২০১৫ সালে পুত্র ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। সুতরাং বারাক ওবামার মত বাইডেনও সাধারণের কথা ভাববেন। ট্রাম্পের মত শুধুই ধনীদের কথা নয়।

ভারতের ক্ষেত্রে যাঁরা আমেরিকায় পড়তে বা চাকরি করতে যাবেন, তাঁদের সুযোগ বাড়ল। কিন্তু কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়া থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে ট্রাম্প চুপ করে থাকলেও বাইডেন তা থাকবেন না বলেই মনে হচ্ছে। ফলে কাশ্মীর প্রশ্নে বা বিভিন্ন ভাবে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর অত্যাচার নিয়ে মুখ খুলতে পারেন বাইডেন। তিনি ট্রাম্পের মত মুসলিম-বিরোধী নন। এতে মোদির চাপ বাড়তে পারে। ট্রাম্প ছিলেন একটা আকাট। দাম্ভিক ব্যবসায়ী।

আর বাইডেন ঝানু রাজনীতিবিদ। পার্থক্য এটাই। হাউডি মোদি আর নমস্তে ট্রাম্প কোনওই কাজে দিল না!

আবার বোঝা গেল হুজ্জুতে ফ্যাসিস্ট সাময়িক জিতলেও বেশি দিন ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না।

জনগণই শেষ কথা বলে। সব দেশেই।

C@Prasun Acharya

Plz like and share.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here