নকশালপন্থী সিপিআই (এম এল) লিবারেশন আর তৃণমূলের মধ্যে কথা # ইয়েচুরির মত উড়িয়ে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন দলের নেত্রী কবিতা কৃষ্ণান # ফেসবুকে লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রসূন আচার্য

0
81

নকশালপন্থী সিপিআই (এম এল) লিবারেশন আর তৃণমূলের মধ্যে কথা, ইয়েচুরির মত উড়িয়ে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন দলের নেত্রী কবিতা কৃষ্ণান

———প্রসূন আচার্য

ক’দিন আগেই লিখেছিলাম, বাংলায় তৃণমূলকে বাঁচতে সক্রিয় হয়েছেন তাদের পুরানো বন্ধু নকশালপন্থীরা।

বিশেষ করে মাওবাদী এবং সিপিআই ( এম এল) লিবারেশনের নেতারা।

তা নিয়ে আমাকে কুৎসিত, কদর্য ভাষায় আক্রমণ করেন কিছু লিবারেশন কর্মী ও ছাত্র নেতা।

তাঁরা আমাকে পেজ বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দেন।

বিজেপির আইটি সেল এই ধরণের কাজ করে বলে এত দিন জানতাম।

কিন্তু একই ধরণের অসহিষ্ণু, উগ্র এবং মূর্খ যে নকশালপন্থীরাও তার প্রমাণ পেলাম।

কলেজ জীবন থেকে প্রায় ৩৫ বছর ধরে দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকে চিনি।

মোটামুটি একই সময় ধরে পরিচিত লিবারেশন নেতা পার্থ ঘোষ, কার্তিক পাল প্রমুখ।

আর ৩৪ বছর ধরে বামেদের ভাষায় ‘তথাকথিত বুর্জোয়া সংবাদপত্রে’ সাংবাদিকতা করলেও, চেষ্টা করেছি, সত্যি খবরের ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ ভাবে রিপোর্টিং করার।

আমার পোস্ট যে সঠিক ছিল, আজ, ১৭ নভেম্বর, বুধবার লিবারেশন এর ফেসবুক পেজে দলের পলিটব্যুরো সদস্য তথা দ্বিতীয় ব্যক্তি কবিতা কৃষ্ণনের পোস্টেই প্রমাণ।

কবিতার পোস্টটি হুবহু তুলে দিলাম।

***********
“আগামী বিধানসভায় বাংলায় বামপন্থীদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে যে বিতর্ক চলেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা:

তৃণমূল বিরোধিতায় বামপন্থীদের অবস্থান অবশ্যই বলিষ্ঠ কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া উচিত যা সরকার বিরোধী ভোট বিজেপিতে যাওয়া আটকাতে পারবে- কথাটা শুনতে সঠিক মনে হচ্ছে।

গণশক্তিতে প্রকাশিত বক্তব্যে সিপিআইএম সাধারণ সম্পাদকও এই যুক্তি দিয়েছিলেন।

তবে আমি স্পষ্ট করে জানাতে চাই যে, সিপিআইএমএল এটা বলছে না।

আমরা বলছি:

১) আমরা বিজেপিকে স্পষ্টভাবে এক নম্বর শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করছি। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে, বিজেপিকে উন্মোচিত করতে হবে, এটাই এক নম্বর করণীয়। সিপিআইএম যা করছে বলে মনে হচ্ছে তা হল রাজ্য সরকার, শুধু মাত্র রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই, এই যুক্তিতে যে, ওটাই বিজেপি বিরোধী কাজ, এভাবেই বিরোধী ভোটকে নিজের দিকে টেনে আনা যাবে।

২) আমরা স্পষ্টতই সাম্প্রতিক বহুল প্রচারিত কোনো রকম “ধাপ তত্ব”, অর্থাৎ “২০২১ এ রাম, ২০২৬ -এ বাম” এইরকম ধারণার সম্পূর্ণ বিরোধী । যেহেতু এ ধারণা ইতিমধ্যে বাম সমর্থকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই সিপিআইএম এবং বাম নেতাদের এই ধারণাটিকে সরাসরি নাকচ করা উচিত, এর জনপ্রিয়তাকে পাল্টা আক্রমণ করা উচিত। এখনো কিন্তু তা হচ্ছে না।

৩) সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে বামদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি হলো : তাঁরা কীভাবে রাজ্যে তাঁদের উপস্থিত শক্তিকে ব্যবহার করে জনগণকে বিজেপির দ্বারা সৃষ্ট অস্তিত্বের সঙ্কট সম্পর্কে সতর্ক করবে। বাস্তবের মাটিতে কেন্দ্রীয় সরকারের জনবিরোধী নীতিমালা এবং বিজেপির সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কী আন্দোলন গড়ে তুলবে?

যখনই প্রয়োজন তখনই তৃণমূলের নীতির বিরোধিতা করতে হবে – কিন্তু কেন আজ বাংলায় বামপন্থীরা তাদের উপস্থিতি এবং শক্তি কেবল টিএমসি, বা মূলত: টিএমসিকে আক্রমণের জন্য ব্যবহার করবে?

৪) সিপিআইএম বলেই চলেছে, “আমরা তৃণমূল এবং বিজেপির প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করি”। তারা কিন্তু “প্রতিযোগিতামূলক হিন্দুত্ব” বলে না, তাদের কথা থেকে তারা বোঝাতে চায় যে, তৃণমূল মুসলিম তোষণ তথা মৌলবাদের প্রতিনিধিত্ব করে, আর বিজেপি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার প্রতিনিধিত্ব করে। এই সূত্রায়ন তো কেবল বিজেপিকেই সহায়তা করে।

৫) সিপিআইএম যখনই বিজেপির কথা বলে, মূলত: তাকে কেন্দ্রীয় সরকার হিসাবে বলে থাকে। যান্ত্রিকভাবে, বোধহয় তারা মনে করে যে কোনও রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে, রাজ্য সরকার এবং রাজ্য শাসক দলকেই আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করতে হবে। এ হয়তো ২০১৪ অবধি সঠিক ছিল, কিন্তু তারপর থেকে বাংলায় বিজেপির স্বতঃর্স্ফূত সাংগঠনিক বিকাশের বিষয়টি অস্বীকার করা অত্যন্ত বোকামি হবে। দেশ বিভাগের পর থেকে, রাজ্যে সাম্প্রদায়িকতার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। বিজেপি এখন সুপ্ত মুসলিমবিদ্বেষী সঙ্কীর্ণতাকে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। জনগণকে এ বিষয়ে সচেতন করা ও প্রতিরোধের কথা বলা তো দূরের কথা, সিপিআইএম এই সমস্যাকে মানতে পর্যন্ত নারাজ।

৬) সিপিআইএম মোদী এবং মমতার মধ্যে একটি মিথ্যা সমতা টানার চেষ্টা করছে। তাদের “মোদী ভাই দিদি ভাই” এই তুলনা বাস্তবের মাটিতে কী প্রভাব ফেলবে? বস্তুগতভাবে, আজ তৃণমূল বিজেপির বিরোধিতা করার অবস্থানে রয়েছে। তাদের মধ্যে সর্বদা ঐতিহাসিক সাদৃশ্য পাওয়া যায়, তবে সেটা তো কংগ্রেসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সিপিআইএম সিপিআইএম-কংগ্রেস জোটকে একটা স্বীকৃত জোট হিসাবে দেখায় এবং টিএমসি ও বিজেপিকে একটি সত্তা হিসাবে দেখতে চায় (বিহারের বিজেপি-জেডিউর মতো)। কিন্তু এটা একটি কল্পকাহিনী ছাড়া আর কি ! বাস্তবে তৃণমূল বিজেপির মাথা ঠোকাঠুকি রয়েছে, সুতরাং “ইয়ে অন্দর কি বাত হ্যাঁয়, টিএমসি বিজেপি এক হ্যায়”, এই শ্লোগানের
কোনো অনুরণন বাস্তবে কারুর কাছে নেই, কেবল তৃণমূল বিরোধিতা করলেই বিজেপিকে আঘাত করা যাবে এমন ভাবনায় জারিত সিপিআইএম সমর্থকদের একটি ছোট্ট অংশ ছাড়া। বামেরা যদি পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী তৃতীয় মেরু হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়, তৃণমূল আর বিজেপিকে এক করে দেখা ও সমস্ত শক্তি দিয়ে কেবল তৃণমূল বিরোধিতা করাই যথেষ্ট, এমন ভান চালিয়ে যাওয়া যাবে না। এর পরে আসে অগ্রাধিকার এবং অনুপাতের প্রশ্ন।

৭) অনুপাত এবং অগ্রাধিকারের প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গে সিপিআইএম টিএমসির বিরুদ্ধে দীর্ঘ আক্রমণ চালিয়ে যায়, যেখানে বিজেপির উল্লেখ প্রায় পাদটীকা, যেটার সম্পূর্ণ বিপরীত করা উচিত। বামদের পক্ষে ফ্যাসিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রাথমিক এবং মূল কর্তব্য হতে হবে।

৮) বস্তুতপক্ষে, বাংলায়ও দীর্ঘ সিপিআইএম শাসনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা রয়েছে, বিশেষত সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম পর্যায়গুলির জন্যে। সিপিআইএম তার বিরুদ্ধে থাকা তাদের সরকার অর্জিত এই ক্ষোভকে মানতে ও পরিবর্তন করতে নারাজ, উল্টে এই কল্পকথার পুনরাবৃত্তি করছে যে রাজ্যে তাদের পরাজয়ের কারণ অনৈতিক মহাজোট, এবং কোনওভাবেই সে নিজে দায়ী নয়। আজ ভারতে কৃষকদের লড়াইয়ে নেতৃস্থানীয় শক্তি বামপন্থীরা – উচ্ছেদের বিরুদ্ধে, খামারের আইনের বিরুদ্ধে। সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রামে তাদের পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভুল ছিল এটা স্বীকার করে নিলে তাদের কিছুই হারানোর নেই এবং পশ্চিমবঙ্গের কৃষক ও শ্রমিকদের কাছে নতুনভাবে পৌঁছে যেতে চাইলে এই স্বীকারোক্তি বরং তাদের অক্সিজেন দেবে।

৯) বামপন্থীদের বিরুদ্ধে টিএমসির ঠগবাজি ও দুর্নীতির ফলে জনগণের ক্রোধ ও সরকার বিরোধিতা টিএমসি নিজেরাই অর্জন করেছে। টিএমসির ঠগবাজি একতরফা ভাবেই বিজেপিকে ‘গণতন্ত্র রক্ষাকারী’ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপিত করার সুযোগ করে দিয়েছে- যা সত্যিই দুঃখজনক। তাই বামপন্থীদের বন্ধু বা সহযোগী বামপন্থী হিসেবে যখন আমরা সিপিআইএম এর সঙ্গে যুক্তিতর্কে লিপ্ত, তখন বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করা ও বৈধতা দেওয়ার জন্য ন্যায্য ভাবেই টিএমসিকে দায়ী করতে হবে।

১০) পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রধান অভিব্যক্তি। রাজনীতিতে বামপন্থী ছাপ/প্রভাব মুছে ফেলার প্রকল্পের দায়ভার ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি গ্রহণ করেছে।”

~কবিতা কৃষ্ণান
পলিটব্যুরো সদস্য
সিপিআই এম এল

************
আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনও মতবাদে বিশ্বাসী হতে পারি।

কিন্তু সত্যটা তাতে বদলে যায় না।

এটাই বস্তু নিষ্ঠ সাংবাদিকতা।

এবং এটাও সত্যি, তৃণমূল-কংগ্রেস-সিপিএম-নকশাল মহাজোট করলেই বিজেপি হেরে যাবে এমন কোনও গ্যারান্টি নেই।

দেওয়াও সম্ভব নয়। বিহারেই হয়নি।

কংগ্রেস নেতা তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নান ইতিমধ্যেই বলেছেন, নকশালরা তৃণমূলের হয়ে দালালি করছে।

তিনি ঠিক বলেছেন, নাকি ভুল, সে কথা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে।

তবে, আমার কাছে খবর, নিয়মিত লিবারেশন নেতৃত্বের সঙ্গে রাজ্যের এক সিনিয়র মন্ত্রী, যিনি মমতা- ঘনিষ্ঠ, তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছে। এমনকি আসন ছেড়ে দেওয়ার কথাও হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ফরওয়ার্ড ব্লক এর নেতাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে।

এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছেন পিকে নিজেই।

কারণ, তিনি অশনিসংকেত দেখছেন।

অর্থাৎ একদিকে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বাম ও কংগ্রেস জোট। যাঁদের হাতে ২০১৯ এর লোকসভার হিসেবে ১২% ভোট।

অন্য দিকে কিছু ছোট বাম দল নিয়ে মমতার জোট। এই রকম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

সকলেই বিজেপিকে আটকাতে চায়। অন্ততঃ মুখে তাই বলছে।

এখন শুভেন্দু অধিকারীর বিদ্রোহ বা তৃণমূল থেকে বেরিয়ে গিয়ে বিজেপির হাত ধরার পরে কী হয়, সেটাই দেখার।

আগামী এক মাসের মধ্যে ছবি অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

C@Prasun Acharya.

Plz like and share.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here