তৃণমূলকে বাঁচাতে নকশালদের দালালি # বিজেপি বিরোধী সিপিএম-কংগ্রেস-তৃণমূল-লিবারেশন মহাজোটের ডাক # নেপথ্যে খেলছেন পিকে # ফেসবুকে লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক প্রসূন আচার্য

0
170

তৃণমূলকে বাঁচাতে নকশালদের দালালি। বিজেপি বিরোধী সিপিএম- কংগ্রেস- তৃণমূল- লিবারেশন মহাজোটের ডাক। নেপথ্যে খেলছেন পিকে
———-প্রসূন আচার্য

বিহার ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই হটাৎ করে আওয়াজ উঠেছে বিজেপিকে রুখতে বাংলাতেও মহাজোট করতে হবে।

আরজেডির সঙ্গে জোট করে ১২ টি আসন জিতে এখন সিপিআই এম এল লিবারেশন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছে।

তাঁদের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য পশ্চিমবঙ্গেও মহাজোট করার ডাক দিয়েছেন।

এমনকি তিনি এতটাই উৎসাহী যে ঘনিষ্ঠ মহলে এটাও বলে দিয়েছেন, বামেদের ৪০/৫০ টি আর কংগ্রেসকে ৪০/৫০ টি আসন ছেড়ে দিন মমতা ব্যানার্জি। আর ২০০ টার মতো আসনে তৃণমূল লড়াই করুক।

বাংলায় আজ পর্যন্ত দীপঙ্করের দল বিধানসভায় একটি আসনও জেতেনি।

এমনকি একার ক্ষমতায় কোনও পুরসভাও জিততে পারবে না! তবু বলতে দোষ কি!

২০০৯ সালে মমতার সঙ্গে জোট করে যেমন এসইউসিআই একটা লোকসভা আসন জিতেছিল, তেমনি যদি লিবারেশন ২/১ টা আসন জিতে যায়!

কলকাতায় পড়াশুনা, রাজনীতি করা দীপঙ্কর কিন্তু একেবারে হওয়ায় একথা বলেননি।

তাঁর কথা নিয়ে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে।

তৃণমূল দলে বহু প্রাক্তন নকশাল নেতা আছেন।

তাঁদের কেউ মন্ত্রী। কেউ সাংসদ।

এক সময়ে দোলা সেন ক্রিক রো-তে দীপঙ্করদের লিবারেশন অফিসে পড়ে থাকতন।

আজ তিনি দিদি ঘনিষ্ঠ সাংসদ।

আছেন পূর্ণেন্দু বসু। আরও অনেকেই।

এমনকি ক’দিন আগে জেল থেকে ছাড়া পাওয়া মাওবাদী ছত্রধর মাহাতোও এখন তৃণমূল নেতা।

তৃণমূলের দিক থেকে সরাসরি বার্তা না পেলে দীপঙ্কর এ বলতেন না।

আসল বার্তা এসেছে পিকের কাছ থেকে।

যত দিন যাচ্ছে এই বাংলায় বিজেপি ক্রমেই রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ এর মতো আচরণ করছে।

তার উপর শুভেন্দু অধিকারী প্রতিদিন হুঙ্কার ছাড়ছেন।

সব মিলিয়েই প্রবল চাপে তৃণমূল। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পরে এমন পরিস্থিতি কোনও দিন হয়নি।

২০২১ সালে তৃণমূলকে জেতাবেন, ভাইপোকে এই ভরসা দিয়ে মোটা   ফি নিয়েছে পিকের কোম্পানি।

কিন্তু পিকে নিজেও বুঝতে পারছেন, কাজটা খুবই কঠিন। যা পরিস্থিতি নিজেই ছুটেছেন কাঁথিতে শুভেন্দুর বাড়ি। বামের ৭% আর কংগ্রেসের ৫% ভোট নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।

যদি বিজেপি বাংলায় জেতে পিকের ভোট কোম্পানি আই-প্যাক এর রেকর্ড এক ধাক্কায় মাটিতে মিশে যাবে। ভবিষ্যতে আর কেউ তাঁকে ডাকবে না। কোম্পানি উঠেও যেতে পারে।

এই চরম পরিস্থিতিতে পিকে নিজেও চাইছেন বাম, কংগ্রেসকে কিছু আসন ছেড়ে দিয়ে একটা মহাজোট গড়তে।

যা তিনি ২০১৫ সালে বিহারে করেছিলেন নীতিশ-লালুকে মিলিয়ে দিয়ে।

আর তাঁর এই কাজে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন কিছু নকশালপন্থী নেতা বা তাঁদের দল।

পিকের হিসেবে দুই দলকে ৬০/৬৫ টি আসন ছাড়লেই তারা রাজি হয়ে যাবে।

এই সুযোগে নকশালরা নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে তুলতে চাইছে।

দীপঙ্কর তাঁর মধ্যে অন্যতম নেতা।

আজ পর্যন্ত বাংলায় আন্দোলন করতে গিয়ে দীপঙ্কর বিরোধী পক্ষের একটা ঢিল বা পুলিশ এর লাঠি খেয়েছেন, সে কথা তাঁর নিন্দুকও বলবে না!

সোশ্যাল মিডিয়া দেখলেই বোঝা যাবে, নকশালপন্থীরা রোজ এই মহাজোটের আবেদন করছেন।

তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়ে নিয়মিত পোস্ট করেছেন সিপিআই, সিপিএমর কিছু কর্মী-সমর্থকও।

যেন তৃণমূল হেরে গেলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে!

আসলে আলিমুদ্দিনে প্রকাশ কারাট পন্থী কিছু নেতা, এমনকি কলকাতা জেলার কিছু নেতাও এই মহাজোটের পক্ষে।

তাতে যদি কিছু আসন জেতা যায়।

যদিও প্রকাশ্যে তাঁরা কিছুই বলছেন না।

ধরা যাক মহাজোট করার পরেও বিহারের মত্য বিজেপি জিতল।

তখন কি বাংলা বঙ্গ-উপসাগরে ডুবে যাবে?

একান্ন বছর আগে সিপিএম ভাগ হয়ে নকশালপন্থী দল বা সিপিআই (এম এল) হওয়ার সময় থেকেই তাদের বড় শত্রু হচ্ছে মার্ক্সবাদীরা।

এর পিছনে নানা কারণে আছে।

সব থেকে বড় কারণ, সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী নকশালরা সব সময়েই মনে করেছে, সিপিএম ভুল রাজনৈতিক পথে মানুষকে চালনা করছে।

একটা শোধনবাদী সংসদীয় পার্টি।

কমিউনিস্ট পার্টিতে মত-বিরোধ হয়ে বিভাজন হলে এক পক্ষ অন্যকে শত্রু বলে মনে করে।

সেই সোভিয়েত আমলে ট্রেটস্কি-হত্যা বা স্ট্যালিন-বাহিনীর বিভিন্ন কার্যকলাপ, মাও এর চিন তার প্রমাণ।

১৯৬৯-৭১ সালে এই বাংলায় নকশালদের হাতে বহু সিপিএম কর্মী খুন হয়েছেন এবং অবশ্যই উল্টোটাও হয়েছে।

আবার ২০০১ থেকে ২০১১ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এর দশ বছরে মাওবাদীদের হাতে জঙ্গলমহলে শতাধিক সিপিএম নেতা ও কর্মী খুন হয়েছেন।

সালকু সোরেনের মতো নেতার মৃতদেহ দিনের পর দিন আকাশের নিচে পড়ে থেকেছে। সৎকার পর্যন্ত করা যায়নি!

তৃণমূলের কেউ কিন্তু খুন হয়নি!

এবং কিষেনজিকে তৃণমূল সরকারের পুলিশ এনকাউন্টার করে মারার পর কিষেনজি-সঙ্গিনী সুচিত্রা মাহাতর মতো বেশি ভাগ মাওবাদী কর্মী তৃণমূলে নাম লিখিয়েছেন!

বিভিন্ন পদ ও নানা রকম সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন।

সিপিএমও ছোট আঙারিয়া-নেতাই এর মতো নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে।

তাদের হাতেও অনেক মাওবাদী সমর্থক মারা গিয়েছেন।

বা বুদ্ধবাবুর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেল খাটছেন।

যদিও অনেকের ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় প্রমাণ নেই।

কিন্তু তৃণমূল আমলেও তাঁরা ছাড়া পাচ্ছেন না।

অর্থাৎ আমি এটাই বলতে চাইছি, বিমান বসুর ডাকে পার্থ ঘোষদের লিবারেশন বৃহত্তর বাম জোটে সামিল হলেও বাংলায় নকশালপন্থীদের সঙ্গে সিপিএমের সম্পর্ক কোনও দিনই ভালো নয়। বরং শত্রুতার।

বামফ্রন্টের আমলে নকশালরা এমনকি এই লিবারেশনও সিপিএমের কট্টর বিরোধী ছিল।

তাদের কাছে মমতা বরং অনেক কাছের মানুষ ছিলেন।

সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম দুই আন্দোলনের পিছনেই নকশালপন্থী ও মাওবাদীরা সমস্ত শক্তি নিয়ে মমতার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মাওবাদী নেতা কিষেনজি আমাকে ইন্টারভিউ দিয়ে বলেছিলেন, মমতাকে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চাই।

প্রদীপ ব্যানার্জির মতো নকশাল নেতা মমতার প্রতিটি সভায় যেতেন।

পরে তিনি তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের নেতা হন।

সুতরাং তৃণমূল-নকশাল যোগ নতুন কিছু নয়।

এই পরিস্থিতিতে কি মহাজোট সম্ভব?

প্রশ্ন করেছিলাম বাম পরিষদীয় নেতা সুজন চক্রবর্তীকে।

তিনি বলেছেন, দীপঙ্কর বলেছেন। দেখেছি। কিন্তু যারা বাংলার পরিস্থিতি জানে, তারা বুঝবে সম্ভব নয়।

একটা খতিয়ান দিলেন সুজনবাবু। মমতার আমলে নয় বছরে তৃণমূলের হাতে খুন হয়েছেন ১৪৭ জন সিপিএম ও অন্য বাম কর্মী। খুন করা হয়েছে বর্ধমানের প্রাক্তন বিধায়ককে। কয়েক হাজার মানুষ মিথ্যের মামলায় জেল খাটছেন। বা খেটেছেন। গায়ের জোরে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৃণমূল দখল করেছে। প্রলোভন দেখিয়ে বামেদের ৬ জন বিধায়ককে দলে নিয়েছে। কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফাই দেননি।

সুজনবাবুর প্রশ্ন: এদের সঙ্গে কী ভাবে জোট হবে?

আর কংগ্রেসের আব্দুল মান্নান শুধু একটা কথাই বললেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে হত্যা করার শাস্তি পাবে মমতা। আমাদের দলের ১৮ জন বিধায়ককে দল ভাঙিয়ে নিয়েছেন। এক জনও ইস্তফা দেননি। সারদা থেকে রোজভ্যালি সব চিটফান্ড মালিকদের বিচার বার বার আটকেছেন। আর ধান্দাবাজ নকশালদের কি আছে ? ওরা তো সব সময়েই মমতার সঙ্গে। আগেও ছিল। এখনও আছে। দালালি করছে।

আসলে যেভাবে মমতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও দলত্যাগ আইনকে বারবার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শুধু বিধায়ক ভাঙানো নয়, পুরসভা, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদ দখল করেছেন, দলে নিতে পুলিশ লাগিয়েছেন কংগ্রেস ও সিপিএমের জেলার নেতা ও কর্মীদের পিছনে, তাতে বাংলায় মহাজোট হওয়া অসম্ভব।

নকশালদের হাত করে পিকে যতই চেষ্টা করুন বিফল হবেন।

কারণ, নিচুতলার বাম ও কংগ্রেস কর্মীরা কখনও তা মেনে নেবেন না।

C@Prasun Acharya

Plz like and share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here