কংগ্রেস গতিহারা রাজ্যে রাজ্যে দাপুটে নেতার অভাবে # ফেসবুকে লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক রূপায়ণ ভট্টাচার্য

0
96

কংগ্রেস গতিহারা রাজ্যে দাপুটে নেতার অভাবে

রূপায়ণ ভট্টাচার্য

বিহারে কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট কে?

সোনালি নীরবতা।

উত্তর প্রদেশ কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট কে?

বিস্ময়মাখা নীরবতা।

ওডিশার?

উত্তরে থাকো মৌণ।

আপনাকে যদি এখন কোনও রাজনৈতিক কুইজে খুব শক্ত প্রশ্ন রাখতে বলা হয়, তা হলে আপাতত এই তিনটে রাখতে পারেন।

বিহারে কংগ্রেসের লজ্জার ভরাডুবি তুলে দিয়েছে অনেক জিজ্ঞাসা। বলা হচ্ছে, কংগ্রেসকে ৭০ আসন না ছেড়ে আরজেডি আরও বেশি আসলে লড়লে এনডিএ আর ক্ষমতায় ফিরতে পারত না। সবচেয়ে পরিচিত সর্বভারতীয় পার্টিকে নিয়ে তাদের ‘মহাগঠবন্ধন’ জোট পার্টিগুলোতেই আজ বিদ্রুপ!

কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় সমস্যা কংগ্রেসই। অধিকাংশ রাজ্যেই কংগ্রেসের কোনও গ্রহণযোগ্য নেতা নেই। সারা রাজ্যে যিনি পরিচিত। যে সব রাজ্যে অমরিন্দর সিং, অশোক গেহলট বা কমল নাথের মতো মুখ রয়েছেন, সেখানে চাকা উল্টো দিকে ঘুরেছে। অন্য জায়গায় নয়। বাংলার কথাই ধরুন। অধীর চৌধুরী লোকসভায় বিরোধী নেতা হয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন, কিন্তু মুর্শিদাবাদের বাইরে তাঁর কোনও প্রভাব নেই। বিহারের থেকেও বাংলায় কংগ্রেসের অবস্থা খারাপ।

বিহারে কংগ্রেস পার্টির রাজ্য প্রেসিডেন্টের নাম মদনমোহন ঝা। দ্বারভাঙার লোক। বাইরে কেউ চেনেন না। চার ওয়ার্কিং প্রেসিডেন্টেরও এক দশা। এই পরিস্থিতিতেও যে কংগ্রেস ১৭ আসন পেল, সেটাই সম্ভবত আশ্চর্যের। প্রধানমন্ত্রী অত ব্যস্ততার মধ্যেও যত সভায় গিয়েছেন, রাহুল তত জায়গাতে যাওয়ার সময় পাননি। প্রিয়াঙ্কা তো যানইনি। দুই ভাই-বোনকে বোঝা দায়। হঠাৎ হঠাৎ তাঁরা সক্রিয় হন। হঠাৎ চুপ করে যান। খুঁজে পাওয়া যায় না তখন। এঁদের থেকে বরং অনেক বেশি লড়াকু মেজাজ অসুস্থ সোনিয়া গান্ধীর। গুরুতর অসুস্থতা নিয়েও যে ভাবে স্বামী-শাশুড়ির পার্টি বাঁচানোর অপ্রাণ চেষ্টা করেন, সবাইকে নিয়ে চলার চেষ্টা চালান, তা বরং চোখে পড়ে। কিন্তু মোদীর বিকল্প মুখ হিসেবে দুই সন্তানের কাউকে তৈরি করতে পারেননি।

প্রত্যেক নির্বাচনে কংগ্রেসের বিপর্যয়ের পর একটা প্রশ্ন অবধারিত ওঠে। কংগ্রেসের পক্ষে আর কি সোজা হয়ে দাঁড়ানো সম্ভব? ঘটনা হল, এই অতি দুর্বল কংগ্রেস আজও বিজেপি ছাড়া একমাত্র সর্বভারতীয় পার্টি। কংগ্রেসই একমাত্র পার্টি, যাদের এই দুর্দশাতেও সব রাজ্যেই কিছু না কিছু অস্তিত্ব রয়েছে। সব ভোটার অন্তত পার্টির নাম জানে। নদী মজে যেতে পারে, সেখানে বান আসলে দু’কূল ভাসবেই। ট্র্যাডিশনাল কংগ্রেসী ভোটার আজও আছে। কিন্তু রাজ্যে অস্তিত্ব থাকবে কী করে, যদি দিনের পর দিন ক্ষমতায় না থাকা রাজ্যে অধীর চৌধুরী বা মদনমোহন ঝায়ের মতো নেতা থাকেন? উত্তর প্রদেশে গান্ধী পরিবার লোকসভা ভোটে দাঁড়ালে কী হবে, রাজ্য প্রেসিডেন্ট বা সচিবের নাম গোটা রাজ্য জানেই না। প্রেসিডেন্ট অজয় কুমার লাল্লু কুশিনগরের লোক। সব রাজ্যেই কংগ্রেসের তথাকথিত রাজনীতিকরা শুধু নয়াদিল্লি ভিত্তিক রাজনীতি করেন। যেমন বিহারের মীরা কুমার। শত্রুঘ্ন সিনহার মতো সুপারস্টারকেও বিহার কংগ্রেস ব্যবহার করতে পারেননি। কোভিড বিশৃঙ্খলা, পরিযায়ী শ্রমিকদের দুরবস্থাকেও কাজে লাগাতে পারেনি বিহারের ভোটে। সেখানে শহরাঞ্চলে এখনও মোদী ক্যারিসমা তুঙ্গে। গ্রামে শ্রমিকদের মনে এখনও অসহ্য যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে জিতে যাচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদ। কারও মনে তাত্ত্বিক প্রশ্ন জাগে না, জয়প্রকাশ-লোহিয়া-জর্জ ফার্নান্ডেজের শিষ্য সোশ্যালিস্ট নীতিশকুমার কী ভাবে হিন্দুত্ববাদের হাত ধরেন।

উত্তরপ্রদেশের উপ নির্বাচনেও এক ছবি।

ভাবা যায় না, একদা উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের মুখ ছিলেন গোবিন্দ বল্লভ পন্থ, কমলাপতি ত্রিপাঠী, হেমবতীনন্দন বহুগুণা, এনডি তিওয়ারি। বিহারে যেমন ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ সিংহ, জগজীবন রাম, আবদুল গফুর, কেদার পাণ্ডে, জগন্নাথ মিশ্র, ভোলা পাসওয়ান, ললিত নারায়ণ মিশ্র। নব্বই দশকের গোড়ায় লালু যাদবের উত্থানের কংগ্রেসের ভোট কমতে শুরু করেছে। এ বার সেই ভোটের হার নেমে এসেছে ৯.৪৮ শতাংশে। জেলবন্দি লালুর সাধের আরজেডির ভোট সেখানে ২৩.১ শতাংশ, বিজেপি ১৯.৫ শতাংশ। বিহারে যদি লালুর হাতে কংগ্রেসের শেষ সলতে পাকানো হয়, উত্তর প্রদেশে সে কাজটা করেছেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। কংগ্রেসের কৃতিত্ব হল, উত্তরপ্রদেশ বা বিহারে দীর্ঘদিন ক্ষমতা হারিয়েও কেন্দ্রে রাজত্ব করেছে একাধিকবার।

ওডিশায় কংগ্রেস তিন নম্বরে চলে গিয়েছে নবীন পট্টনায়কের স্ট্র্যাটেজিতে। দুটো উপনির্বাচনে এ বার দুটোতেই জিতেছে নবীনের বিজেডি। নবীন অসুস্থ। বেশি ভাষণে যান না। বেশি পার্টি নেতাদের নিয়ে ঘরোয়া রাজনীতি করেন না। সব মন্ত্রীর নামও জানেন না। বেশি জনতার মধ্যে যান না। পথেও নিয়মিত নামেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো। কিন্তু কুড়ি বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি উপনির্বাচনে বিজেপির একটি ছিনিয়ে আনেন, অন্য আসন ধরে রাখেন। কংগ্রেসকে তিন নম্বরে পিছনে ফেলে দিয়ে। বিজেপি দাঁত ফোটাতে পারেনি নবীন ম্যাজিকে। সাম্প্রতিক ভারতীয় রাজনীতিতে এ এক অন্যতম আশ্চর্য ঘটনা। নবীনের বকলমে অতীতে রাজ্য চালাতেন ব্যুরোক্র্যাট প্যায়ারিমোহন মহাপাত্র। নবীন যখন ২০১২ সালে ইংল্যান্ডে, তখন প্যায়ারিমোহন সরকার ফেলে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। নবীন এসে হাল ধরেন। কিন্তু এখনও তিনি সরকার চালান আমলাদের দিয়ে। মন্ত্রীদের থেকে ওডিশায় বেশি ক্ষমতাবান সচিবরা। এখন প্যায়ারিমোহনের ভূমিকায় তামিলনাড়ু থেকে আসা আইএএস অফিসার ভিকে পান্ডিয়ান। সবই তাঁর নির্দেশে হয় ওডিশায়।

সিকিমের পবন চামলিং, বাংলার জ্যোতি বসুর মতো পাঁচবার টানা মুখ্যমন্ত্রী নবীন। সেখানেও কংগ্রেসের রাজ্য প্রেসিডেন্ট নিরঞ্জন পট্টনায়কও তেমন সক্রিয় নন, গোটা রাজ্যে পরিচিত নন। যেমন অতীতে ছিলেন হরেকুষ্ণ মহতাব, নন্দিনী শতপথি, জানকীবল্লভ পট্টনায়ক, এমনকী হেমানন্দ বিসওয়াল। ওডিশাতেও কংগ্রেস মজে যাওয়া মহানদী। সৎ ভাবমূর্তির নেতার অভাবে। ওডিশায় জানকীবল্লভ পট্টনায়কের কংগ্রেসের দুর্নীতি এখনও ভোলেনি মানুষ। অসুস্থ নবীন যে আমলাদের দিয়ে কাজ চালিয়েও ভোট নিয়ে যাচ্ছেন, তার একটা কারণ এটাই। লোকে ভাবছে, আর তো অসৎ নেতাদের দেখতে হচ্ছে না।

বছর পঁয়তিরিশ আগে, রাজীব গান্ধীদের আমলে ভোটের প্রচারের জন্য দেশের নামী বিজ্ঞাপনী সংস্থা রিডিফিউশন সংস্থাকে এনে সোরগোল ফেলেছিল কংগ্রেস। কাগজে কাগজে রাজনৈতিক পার্টির পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন ওই সময় প্রথম দেখা যায়। প্রথমবার তাদের প্রচার নিয়ে ধন্য ধন্য পড়েছিল পার্টি জেতায়। দ্বিতীয়বার কংগ্রেস হারায় তারাই হয়ে ওঠে খলনায়ক। ওই সময়ই পাতাজোড়া কংগ্রেসের বিজ্ঞাপনে একবার পড়েছিলাম, ‘আপনাদের হাতে রয়েছে ক্ষমতা, আমাদের হাতে রয়েছে গতিশীলতা, কংগ্রেসকে ভোট দিন জনতা।’

কাশ্মীর থেকে কুমারিকা, একদা রাজ করা মহানদী কংগ্রেসের সেই ‘গতিশীলতা’ হারিয়ে যাচ্ছে রাজ্যে রাজ্যে দাপুটে ও সংবেদনশীল নেতার অভাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here