আনিস আহমেদ # আমার এই লেখাটি নিউ ইয়র্কের প্রথম আলোতে ভিন্ন শিরোনামে প্রকাশ পায় # পড়ার সুবিধার জন্য লেখাটি এখানে আবার পোস্ট করলাম # সন্ধান কেবল সাদা মনের মানুষের

0
28

# আনিস আহমেদ।।।।।।।।।।।।।

আমার এই লেখাটি নিউ ইয়র্কের প্রথম আলোতে ভিন্ন শিরোনামে প্রকাশ পায় । পড়ার সুবিধার জন্য লেখাটি এখানে আবার পোস্ট করলাম।।।।।।।।।।।।।

# সন্ধান কেবল সাদা মনের মানুষের

আজকাল সাদা মনের মানুষ কথাটি একটি প্রচলিত পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।

এই শব্দবন্ধটি আমার খুব পছন্দ ।

এটি কোন ক্রমেই বর্ণবৈষম্য অর্থে ব্যবহৃত নয় , দেহের বর্ণ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হন না তাঁরা , নিষ্কলুষ মনের অধিকারি যাঁরা , তাঁরাই প্রকৃত অর্থে সাদা মনের মানুষ।

সেই অর্থে একজন কৃষ্ণা্ঙ্গও সাদা মনের মানুষ হতে পারেন আবার একজন শ্বেতাঙ্গের মনেও হয়ত কালিমা লেপন করা থাকতে পারে ।

আমি অতএব সাদা মনের সেই মানুষের সন্ধান করি , যিনি সকল কপটতার ঊর্ধ্বে থাকবেন ।

বুঝবেন কুটনীতি এবং কুটিলতার মধ্যে সুক্ষ্য পার্থক্যটুকু ।

দূর্ভাগ্যবশত এখন এমন লোকের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে যারা কুটিলতাকে কুটনীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে নিজেরাই নিজেদের অভিনন্দিত করেন এবং সহজেই বাহবা কুড়িয়ে ফেলেন এই বিদেশ বিভুঁইয়েও নিজেদের অযোগ্যতাকে আড়াল করে।

বিখ্যাত দর্শনিক অ্যারিস্টটল যখন তাঁর পলিটিক্স নামের বইয়ে মানুষকে রাজনৈতিক প্রাণী বা political animal বলে সংজ্ঞায়িত করেন তখন বাহ্যত বিষয়টি নির্বিবাদেই মেনে নেয়া যায় কারণ রাষ্ট্রিক সম্পৃক্ততায় সেই অ্যারিস্টটলের সময় থেকে আজ অবধি মানুষ মাত্রই রাজনীতিতে তার আগ্রহ প্রকাশ করে এসেছে।

নানান তন্ত্র মন্ত্রে সে বিশ্বাস স্থাপন করেছে, প্রচার ও প্রসারের চেষ্টা করেছে, সোচ্চার বা নীরবে ।

রাজতন্ত্র থেকে নানান পথ ঘুরে গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র পর্যন্ত যে একটি রাষ্ট্রের যাত্রা , তা সে মসৃণই হোক কিংবা দূর্গম তাতে মানুষের ভূমিকাটাই মূখ্য ।

এমন কী যে ব্যক্তি খুব জোরে শোরেই বলেন যে তিনি খুব অরাজনৈতিক এক ব্যক্তি তাঁর এই বাহ্য অরাজনৈতিকতা সত্বেও, ভেতরে এক ধরণের রাজনীতিবোধ কাজ করে।

তবে আমি যে রাজনীতির কথা এখানে বলছি তার সঙ্গে না আছে রাজার যোগ, না আছে রাষ্ট্রের।

আমি সেই কুট-রাজনীতির কথা বলছি যে রাজনীতি একান্তই ব্যক্তিকেন্দ্রীক, যে রাজনীতি স্বার্থান্বেষী এবং যে রাজনীতি চোরকে বলে চুরি কর, গৃহস্থকে বলে হুঁশিয়ার থেকো।

সেটি কোন দল কিংবা সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট নয়, সম্পূর্ণভাবেই আত্মকেন্দ্রীক।

সেই political animal মানুষের মধ্যে রাজনীতির সঙ্গে পশুত্বের একটা সমীকরণ সাধন করে এবং সেখানে রাজনীতিকে অতিক্রম করে যায় পাশব মনোবৃত্তি ।

বৃহত্তর রাজনীতির ক্ষেত্রে যেমন ব্রিটিশরা Divide and Rule নীতি অনুসরণ করে বিভাজন সৃষ্টি করেছিল, তেমনি ব্যক্তি ক্ষেত্রেও বিভাজন কর এবং শাসন কর এই পন্থা অনুসরণ করেন কেউ কেউ।

বন্ধুত্বের মধ্যে যে একধরণের নিঃস্বার্থ বিষয় থাকে এই বক্র রাজনীতি তাকে বিকৃত করে বার বার।

আমরা কখনও কখনও সেই পশুত্ব পোষণ করি , কখনওবা পশুত্বের বলি হয়ে যাই নিজেরাই ।

এ রাজনীতি আসলে একধরণের মনস্তাত্বিক বিষয় যেখানে কখনও ঈর্ষান্বিত হয়ে, কখনও নিজের অহেতুক কর্তৃত্ব জাহির করার প্রয়াস হিসেবে আবার কখনওবা হীনমন্যতা বোধ থেকে আমরা এই দুষ্টু রাজনীতিকে ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়ে উঠি ।

এই মনোবৃত্তি আফিমের নেশার মতোই মারাত্মক ।

একবার সেটা যদি কাউকে কাবু করে তা হ’লে তা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না বা কখনও যদিবা বের হওয়া যায় সে, বোধ করি, কেবল সাময়িক সময়ের জন্যে, আবার প্রত্যাবর্তন ঘটে সেই ষড়যন্ত্রের দিকে।

মনের এই দুষ্টুচক্রের হাতে জিম্মি এই ‘রাজনীতির পশু’ হয়ত বোকার স্বর্গেই বাস করে , বোঝে না কখনই যে তার মানসিকতার অলিতে গলিতে ঘোরে অন্যরাও বাহ্যত করতালি দেয় , বাহ বাহবা বলে কিন্তু জানে ঠিকই কতটা বক্র পথে হাটছেন লোকটা ।

কর্তৃত্বের করতালিতে মুখরিত থাকতেই বরাবর ভালোবসে এ ধরনের মানুষ ।

চালাকি ও বিচক্ষণতার মধ্যে যে তফাত্ বিস্তর সেটুকুই কেবল বোঝেন না তারা , বোঝেন অন্যরা সকলেই , কেউ অট্টহাসি হাসেন , কেউ মুচকি হাসেন কেউ বুদ্ধিদীপ্ত নীরবতায় অনুভব করেন বাহ্যত বুদ্ধিমানদের নির্বুদ্ধিতা।

আমরা এক সময়ে যাকে ভিলেজ পলিটিক্স বলে সমালোচনা করেছি, শুধু শুধু গ্রামের সহজ সরল মানুষদের অসংখ্যবার দায়ী করেছি তখন একবারও কি ভেবে দেখেছি যে গ্রাম নয় , শহরেই প্রধানত এই ধরণের কুটবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের অভাব নেই, অভাব নেই বিদেশের উন্নত স্থানগুলোতেও।

এ কী তা হলে বাঙালিত্বের বৈশিষ্ট, ঈর্ষান্বিত হয়ে ক্ষমতায় থেকে কুটবুদ্ধি প্রয়োগ করা কিংবা অধ:স্থনের উপর অযথা চাপ প্রয়োগ করে তাকে দিয়ে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করা অথবা একের ঘাড়ে বন্দুক রেখে অপরকে গুলি করা।

না এজন্যে কেবল বাঙালিকে দায়ী করা চলবে না ।

আমাদের যোগাযোগ, ওঠা-বসা প্রধানত বাঙালিদের নিয়েই সে জন্যই আমরা দোষে-গুণে বাঙালিদেরই বিচার করি কেবল ।

তবে এটাই তো স্বাভাবিক যে এ ধরণের মানসিক ভাবে বিকারগ্রস্ত মানুষ যখন, তা সে যতই বাঙালি হোক না কেন, আমাদের কুসুমিত পথকে কন্টকাকীর্ণ করতে চায়, শুভাকাঙ্খী সেজে ক্ষতি সাধন করে ফেলে তখন আমরা অনুভব করি পোশাকি আর প্রকৃত চেহারার মধ্যকার পার্থক্য।

অনেক সময়ে মনে মনে হাসি এ কথা ভেবে, যে অহর্নিশ অভিনয় করে যাচ্ছে সে,অথচ বোঝেনা যে অভিনয়টুকু অন্য কারও বোঝার ক্ষমতা আছে।

এই দ্বিবিধ অথচ পরস্পরবিরোধী ভূমিকা পালনের কারণটা ঠিক কি ?

মনস্তত্ববিদরা বলেন নিজস্ব এক ধরণের হীনমন্যতা বোধ থেকে কৃত্রিম কর্তৃত্ববাদী ভূমিকা পালনের জন্য এ জাতীয় ব্যক্তি সীমা লংঘন করেন এবং সমাজে এক ধরণের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন।

আর হীনমন্যতাবোধটি আসে যে কোন যোগ্যতার অভাবের জন্য যে যোগ্যতা নিয়ে এ ধরণের ব্যক্তিরা অকপট মিথ্যাচার করে যান ।

বোঝেন না যে কিছু লোককে সব সময় বোকা বানানো যায়, আর সব লোককে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় তবে সব লোককে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না।

তা না হয় নাই-ই বুঝলেন এই মানুষেরা , কথিত ভক্তকুল নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকলেন এবং এতটাই বোকামির পরিচয় দিলেন যে বুঝলেনই না যে ভক্তদের ভক্তিতেও থেকে যায় ভন্ডামি ।

এই নির্বুদ্ধিতার জন্যে এ ধরণের মানুষের প্রতি আমার করুণা হয় বটে।

এর বেশি বোধ হয় আর কিছুই নয়। তাই বার বার এই ধরণের কুটিলতার বেড়াজাল পেরিয়ে আমি নিয়ত সন্ধান করি সেই সাদা মনের মানুষদের যাঁরা হৃদয়ের অনুভূতি দিয়ে আলিঙ্গন করবেন অন্য মানুষকে।

হোক না কেন তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কম কিংবা জ্ঞানের দৌড়ে পিছিয়ে গেছেন, মনের সারল্যেই তাঁরা থাকবেন আমাদের সকলের হৃদয় জুড়ে।

জয় হোক সর্বত্রই সাদা মনের মানুষের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here