আজ ২৫ নভেম্বর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন # অবনী বাড়ি আছো # দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া # কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া # অবনী বাড়ি আছো # যেতে পারি যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি কিন্তু, কেন যাবো # বেঙ্গল ওয়াচের জন্য কলম ধরলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্যামলেন্দু মিত্র # আমার মনে হয় এত শক্তিশালী ও ভাল মনের  কবি  আর জন্মাবে কি না সন্দেহ

0
62
# বেঙ্গল ওয়াচের জন্য কলম ধরলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্যামলেন্দু মিত্র #
।।।।।।।।।। শ্যামলেন্দু মিত্র।।।।।।।।।।।।
আমি কবি-সাহিত্যিক-লেখক নই।
আমি একজন সামান্য সাংবাদিক।
আজ ২৫ নভেম্বর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। শক্তিদাকে দু-চার কথা লেখার চেষ্টা করলাম।
আমার মনে হয় এত শক্তিশালী ও ভাল মনের  কবি  আর জন্মাবে কি না সন্দেহ।
আমি বর্তমান থেকে আনন্দবাজারে জয়েন করি ১৯৯৩ সালের ৮ অক্টোবর।
প্রথম দিনই  আনন্দবাজার ডেস্কে দেখি শক্তিদাকে।
তিনি আননবাজারের সাব এডিটর৷ কী পদে ছিলেন জানি না।
আমার মতে, আনন্দবাজারে বরুণ সেনগুপ্তের পর শক্তিদা ছিলেন জনপ্রিয়।
তিনি কত বড় কবি তা মানুষ বলবে।
তিনি কোনও কিছুর ধার ধারতেন না।
না ধর্ম,না জাত, না রাজনীতি।
এই মানুষই পারেন, বাজার করতে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাওড়া স্টেশন হয়ে শিমুলতলায় মহুয়া খেতে চলে যেতে।
আনন্দবাজারের সম্পাদক অভীক সরকার একবার ঠিক করলেন, গঙ্গাসাগর মেলা কভার করতে  সাংবাদিক না পাঠিয়ে কবি-সাহিত্যিক পাঠাবেন।
সেইমতো  একবার গঙ্গাসাগরে পাঠানো হল কবি শক্তি চট্টাপাধ্যায়কে।
শক্তিদা গেলেন গঙ্গাসাগর।
তখন ফোনে ট্রাঙ্ককল লাইন। ফোন পাওয়াই কঠিন।
দিন যায়,সন্ধে পার হয়। রাত ১০ টা।
শক্তিদার ফোন নেই।
সেদিন  ডেস্কে নাইট ডিউটিতে তীর্থ আচার্য।
নিউজ এডিটরের নির্দেশে অনেক কষ্ট কসরত করে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে শক্তিদাকে তীর্থ ধরল।
তীর্থ জিজ্ঞাসা করল, শক্তিদা কপি কোথায়?
কিসের কপি?
আপনি গঙ্গাসাগর গেছেন।
শক্তিদার জবাব,  হ্যা,গঙ্গাসাগরেই রয়েছি তো।
কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
তীর্থ বলল, ফোনেই বলুন।
শক্তিদা বলছেন, কাগজ নে। লেখ শক্তি চট্টোপাধ্যায় কমা গঙ্গাসাগর। তারপর বিসর্গ। তলায় লাইন টান।
 লেখ, যেদিকে তাকাই শুধু মানুষের মাথা।
ট্রাঙ্ককল লাইন কেটে গেল। আর ধরা গেল না শক্তিদাকে ।
তীর্থ পিটিআই,ইউএনআইয়ের কপি দেখে গঙ্গাসাগরের কপি লিখে দিল। তা বেরুল শক্তিদার বাই লাইনে।
ফিরে এসে তীর্থকে ভরপেট এলফিনে খাইয়েছিলেন শক্তিদা।
বর্ণময় চরিত্র।
যেসব প্রকাশক শক্তিদার বইয়ের রয়ালটি দিতে ভোগাতো তাদের দোকানের সামনে ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়া দিতে বলতেন। যা উসুল হয়।
 আনন্দবাজারের মালিকদেরও রেওয়াত করতেন না।
 বলতেন, দাদুর কোম্পানি,করে খাও। তবে, বাবা রেখেঢেকে খেয়ো।
আমি শক্তিদাকে প্রায় ২ বছর আনন্দবাজারে কাছ থেকে দেখেছি।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রয়াত হন  ১৯৯৫ সালের ২৩ মার্চ। তার মরদেহে প্রণাম জানানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।
তিনি ছিলেন  জীবনানন্দ-উত্তর যুগের বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান আধুনিক কবি।
তার জন্ম ১৯৩৩ সালের ২৫ নভেম্বর।
মাত্র ৬১ বছর বয়সে ১৯৯৫ সালের ২৩ মার্চ তিনি মারা যান।
আনন্দ পুরস্কার (১৯৭৫), সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৮৩) সহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন।
১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো’  কাব্যগ্রন্থ ইংরেজি এবং মৈথিলী ভাষায় অনুদিত হয়।
১৯৮৩ সালে এই কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৭৪ সালে তিনি পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত ছেঁড়া তমসুখ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন।
 দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জয়নগরে তার জন্ম। মা কমলা দেবী এবং বাবা বামানাথ চট্টোপাধ্যায়।
 চার বছর বয়সে শক্তির বাবা মারা যান। দাদু  দেখাশোনা  করেন।
১৯৪৮ সালে শক্তিরা  কলকাতার বাগবাজারে আসেন এবং মহারাজা কাশিম বাজার পলিটেকনিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন।
সেখানে তিনি বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক দ্বারা মার্কসবাদের পরিচিতি লাভ করেন।
 ১৯৪৯ সালে তিনি প্রগতি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন।  প্রগতি নামে একটি হাতে-লেখা পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করেন।  পরবর্তীতে তা মুদ্রিত রূপ নেয়। এবং পুনরায় নাম বদলিয়ে বহ্নিশিখা রাখা হয়।
১৯৫১ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে  সিটি কলেজে ভর্তি হন।
 একই বছর তিনি ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সদস্য হন।
 ১৯৫৩ সালে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক বাণিজ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
 পরে তিনি বাণিজ্য  ছেড়ে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকের জন্যে প্রেসিডেন্সি কলেজ  ভর্তি হন। কিন্তু পরীক্ষায় উপস্থিত হননি।
১৯৫৬ সালে, শক্তিকে তার মামার বাড়ি যেতে  হয়।
পরে তিনি  মা ও ভাইয়ের সঙ্গে আল্টাডাঙ্গায় একটি বস্তিতে চলে যান।
সে সময়ে তিনি সম্পূর্ণরূপে তার ভাইয়ের স্বল্প আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
দারিদ্রের কারণে শক্তি স্নাতক পাঠ অর্ধসমাপ্ত রেখে প্রেসিডেন্সি কলেজ ত্যাগ করেন। এবং সাহিত্যকে জীবিকা করার উদ্দেশ্যে উপন্যাস লেখা শুরু করেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকলেও কোনও পেশায় দীর্ঘস্থায়ী হননি।
একসময় তিনি  সহকারি হিসেবে
ক্সবি ফার্মা লিমিটেডে কাজ করেছেন।
 পরে ভবানীপুর টিউটোরিয়াল হোমে  শিক্ষকতা করেন।
ব্যবসা করার চেষ্টাও করেন।  ব্যর্থ হওয়ার পর একটি মোটর কোম্পানিতে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দেন।
তিনি ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী  মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়।
 ১৯৬৫ সালে আড্ডার মধ্য দিয়ে তাদের প্রথম সাক্ষাত ঘটে। তাদের মেয়ে তিতি চট্টোপাধ্যায়।
 ১৯৫৬ সালে মার্চে শক্তির কবিতা যম বুদ্ধদেব বসুর কবিতা সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
এরপর তিনি কৃত্তিবাস এবং অন্যান্য পত্রিকায় লিখতে শুরু করেন।
বুদ্ধদেব বসু তাকে নবপ্রতিষ্ঠিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য কোর্সে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানান। শক্তি কোর্সে যোগদান করলেও সম্পূর্ণ করেননি।
১৯৫৮ সালে শক্তি সিপিআইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক চ্যুত করেন।
তার র প্রথম উপন্যাস  কুয়োতলা।
 কিন্তু কলেজ জীবনের বন্ধু সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে তার বনাঞ্চল – কুটির চাইবাসায় আড়াই বছর থাকার সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন সফল লিরিকাল কবিতে পরিণত হন।
একই দিনে বেশ কয়েকটি কবিতা লিখে ফেলার অভ্যাস গড়ে ফেলেন তিনি।
শক্তি নিজের কবিতাকে বলতেন পদ্য।
ভারবি প্রকাশনায় কাজ করার সূত্রে তার শ্রেষ্ঠ কবিতার সিরিজ বের হয়।
পঞ্চাশের দশকে কবিদের মুখপত্র কৃত্তিবাস পত্রিকার অন্যতম কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
তার উপন্যাস অবনী বাড়ি আছো?
দাঁড়াবার জায়গা ইত্যাদি প্রকাশিত হয়।
রূপচাঁদ পক্ষী ছদ্মনামে অনেক ফিচার লিখেছেন।
তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হে প্রেম, হে নৈশব্দ’ ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় দেবকুমার বসুর চেষ্টায়।
১৯৬১ সালের নভেম্বরে ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে যে ৪ জন কবিকে হাংরি আন্দোলনের জনক মনে করা হয় তাদের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় অন্যতম ।
অন্য ৩ জন হলেন সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায় এবং মলয় রায়চৌধুরী।
ওই তিনজনের সঙ্গে  মতান্তরের জন্য ১৯৬৩ সালে তিনি হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতে যোগ দেন ।
তিনি প্রায় ৫০টি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন।
পরবর্তীকালে কৃত্তিবাসের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম সাহিত্যিক মহলে একত্রে উচ্চারিত হয়। যদিও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
এবং কৃত্তিবাস পত্রিকায় ১৯৬৬ সালে সেই মনোভাব প্রকাশ করে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উল্লেখ্যযোগ্য  সৃষ্টির কিছু অংশ তুলে ধরা হল…..
মনে মনে বহুদূর চলে গেছি – যেখান থেকে ফিরতে হলে আরো একবার জন্মাতে হয়
জন্মেই হাঁটতে হয়
হাঁটতে-হাঁটতে হাঁটতে-হাঁটতে
একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছুতে পারি
পথ তো একটা নয় –
তবু, সবগুলোই ঘুরে ফিরে ঘুরে ফিরে শুরু আর শেষের কাছে বাঁধা
নদীর দু – প্রান্তের মূল
একপ্রান্তে জনপদ অন্যপ্রান্ত জনশূণ্য
দুদিকেই কূল, দুদিকেই এপার-ওপার, আসা-যাওয়া, টানাপোড়েন –
দুটো জন্মই লাগে
মনে মনে দুটো জন্মই লাগে
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।
এতো কালো মেখেছি দু হাতে
এতোকাল ধরে!
যেতে পারি
যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি
কিন্তু, কেন যাবো?
যাবো
কিন্তু, এখনি যাবো না
একাকী যাবো না অসময়ে।।
ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে
মানুষ ছিলো নরম, কেটে , ছড়িয়ে দিলে পারতো।
পথের হদিস পথই জানে, মনের কথা মত্ত…
মানুষ বড় শস্তা, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো !
মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও,
মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও,
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।
তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মতো মনে পড়ছে,
সন্ধে হলে মনে পড়ছে, রাতের বেলা মনে পড়ছে।
মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও,
এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও,
মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও।
আজকে তোমার ভিতর-বাইরে বিষম যুদ্ধ পুবের হাওয়া।
রূপোলি মাছ পাথর ঝরাতে ঝরাতে চলে গেলে
একবার তুমি ভালবাসতে চেষ্টা করো
অবনী বাড়ি আছো?
দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া
কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া
‘অবনী বাড়ি আছো?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here