আজকের সাপ্তাহিক বাঙালীতে প্রকাশিত আমার এই লেখা # পাঠকদের পড়ার সুবিধার্থে এখানে আবার পোস্ট করলাম # এই আমিতো ,সেই-ই আমি # আনিস আহমেদ

0
82

আজকের সাপ্তাহিক বাঙালীতে প্রকাশিত আমার এই লেখা, পাঠকদের পড়ার সুবিধার্থে এখানে আবার পোস্ট করলাম

এই আমিতো ,সেই-ই আমি
আনিস আহমেদ

একাত্তরের সেই আমি এই একুশ শতকের দ্বার প্রান্তে এসে বদলাইনি একটুকুনও। বদলেছে শুধু আমার বাইরের অবয়ব ।

চুলে পাক ধরেছে বেশ আগেই, চশমার পাওয়ারও বেড়ে গেছে এবং দেহের মধ্য-প্রদেশ খানিকটা স্ফীত হয়েছে আর সময়ের মাপকাঠিতে সেদিনের এস এস সি পরীক্ষার্থী কিশোর সেই আমি এখন প্রৌঢ়ত্বের দেয়াল ডিঙ্গাচ্ছি দ্রুত।

কিন্তু মনের দিক দিয়ে এখনকার এই আমি আসলে তো একাত্তরেরই সেই আমি ।

একাত্তরের কালো রাত অতিক্রম করতে না পারলে আমরাতো থেকে যেতাম সেই ভিন দেশের মানুষ হিসেবে যারা আমাদের সংস্কৃতির উপর তীব্র আঘাত হেনেছিল সেই আটচল্লিশ থেকেই ।

তা হ’লে কি একাত্তরেই আমরা রয়ে গেছি ? আমি বলবো হ্যা , আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি , প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ‘এর অংশ হয়েছি আমাদের অনুভব এবং আমাদের অনুপ্রেরণা সবটাই আসছে একাত্তরের কাছ থেকে।

একাত্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হ’লে বাঁচবো কী করে।

জানি হয়তো আমার পুত্রতূল্য আজকের কোন তরুণ প্রজন্ম বলবে, “বাবা, তুমি এখনও পড়ে আছো সেই প্রায় ৫০ বছর আগে, এই ৫০ বছরে বিশ্ব এগিয়েছে অনেক দূর , আমরা তো এখন ভার্চুয়াল জগতের বাশিন্দা যেখানে শারিরীক দূরত্ব সামাজিক সম্মিলনের ক্ষেত্রে কোন বাধাই নয়। এমনটি কি ভেবেছিলে একাত্তরে কখনও”?

আমার উত্তর হবে, না ভাবিনিতো । এ সব অগ্রগতি স্বপ্নের ও অতীত ছিল একাত্তরে কিন্তু যে স্বপ্নটা আমরা বাস্তবায়িত করেছি, সেই স্বপ্ন সংরক্ষণে এখনকার বাঙালি তরুণ প্রজন্ম কতখানি সক্রিয়। জানি হয়ত অনেকেই বলবেন এখন আর স্বপ্ন সংরক্ষণের প্রয়োজন কি ?

একাত্তরের এই ডিসেম্বর মাসেই তো স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে, তা হলে পঞ্চাশ বছর পর এ নিয়ে দুশ্চিন্তা কেন? এ প্রশ্ন হয়ত বাহ্যত অযৌক্তিক নয় আদৌ এবং এটাও আশা করা যায় না যে প্রায় ৫০ বছর আগেকার আমি সেই অনুভুতির অনুরণন পাবো আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে ।

কিন্তু যেটা একান্তই কাঙ্খিত তা হলো আজকের বাঙালি তারুণ্য শক্তি যেন মূল্যায়ন করতে পারে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা কি অর্জন করতে পেরেছি এবং কতটুকু অর্জন করা এখনো বাকি রয়েছে।

প্রযুক্তির প্রসার বরঞ্চ এর ইতিহাস এবং দর্শনকে আমাদের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে সহজেই এবং এ ক্ষেত্রে এখনকার এই একুশ শতকের তারুণ্য শক্তি অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করতে পারে।

আমাদের সৌভাগ্য যে আশির দশকে যে তরুণরা সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হয়েছিল, ইতিহাসের ভুল ব্যাখ্যার ঘুপচি গলিতে পথ হারিয়েছিল, তারা এখন অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানে। সেটা আমাদের জন্য একটা স্বস্তির বিষয় নিঃসন্দেহেই ।

মাঝে মাঝে অবশ্য কেন জানি ঘর-পোড়া গরু হয়ে যাই, সিঁদুরে-মেঘ দেখেও শঙ্কিত হই মনে মনে। আর সে যে সব সময়ে কেবল সিঁদুরে মেঘ তাতো নয় , সত্যি সত্যিই ঝড়ের আভাসও যে পাই সেও এক রূঢ় সত্য। বাংলাদেশের তারুণ্য শক্তি এখন দ্বিধাবিভক্ত এবং খানিকটা দ্বিধান্বিতও বটে। বিশাল সংখ্যক তরুণ-তরুণী তাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা যাই হোক না কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে অবিকৃত ভাবে রক্ষা করার পক্ষে।

তারা পেশাজীবি উদ্যমী তরুণ, রাজনীতি নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা নেই ।

তারা গতিশীল অর্থনীতিতে সন্তুষ্ট , দেশের জন্য গৌরব বোধ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে দলীয় বিভাজন বা বিকৃতিকরণের পক্ষে নয়।

আছে আরও একদল তরুণ, যাদেরকে অনেকেই বলেন নব্য আওয়ামী লীগার কিংবা নব্য বঙ্গবন্ধু প্রেমী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি তাদের বিশ্বস্ততা বাহ্যিক, ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যতিব্যস্ত এবং সে কারণেই হয়ত তাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু বলে মুখে ফেনা তুলছেন কিন্তু চেতনায় কোন সাড়া জাগছে না।

এরা হয়ত সংখ্যায় খুব বেশি নয় কিন্তু তাদের আস্ফালনে বিভ্রান্ত হন প্রকৃত বঙ্গবন্ধু প্রেমীরা, হয়ত নীরবে পিছিয়ে আসেন অনেকটাই, বিশেষত যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে দলীয় সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করতে চান না, দেখতে চান বাঙালি জাতির বৃহত্তর ক্যানভাসে, তাঁরা অকস্মাত্ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।

তবে সব চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন মগজ ধোলাই হওয়া একদল তরুণ-তরুণী যারা সেই পাকিস্তান আমলের মতো ধর্ম ও রাজনীতিকে এক করে দেখছেন এবং অসম্প্রাদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মৌল আদর্শকে মানতে পারছেন না।

ধর্মে ভক্তির চাইতে শক্তি এবং বিশ্বাসের চাইতে বাহ্যিক আচারের উপর যারা জোর দিতে চান সেই আচারসর্বস্ব তরুণ সমাজ অভ্যন্তরীণ ভাবে যেমন তেমনি বৈদেশিক ভাবেও এমন ভাবে প্রভাবিত হন যে নিজের অজান্তেই তাঁরা যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে।

বৈদেশিক প্রভাবটি আসছে আরব বিশ্ব থেকে ।

মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি শ্রমিকরা কেবল তাঁদের শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করেন তাই-ই নয় , সঙ্গে তাঁরা উপার্জন ( উপ-অর্জন অর্থে) করেন এমন কিছু ভ্রান্ত মতবাদ যা পীর ফকিরের প্রেমে ভক্তিতে উদ্ভাসিত বাংলাদেশে নিয়ে আসে ভিন্ন এক তত্ব যা আত্মিক নয় , যান্ত্রিক ধর্ম পালনে আমাদের তারুণ্য শক্তির মগজ ধোলাই করে ।

আর সেই কারণে এ ধরণের তারুণ্য শক্তি , পোশাকে আশাকে , সমাজে সংস্কৃতিতে একটা আমুল কথিত বিশুদ্ধবাদী পরিবর্তন নিয়ে আসে ।

এই পরিবর্তনের কারণেই বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার সঙ্গে তাদের সম্পর্কটা হয়ে দাঁড়ায় সাংঘর্ষিক।

এই উপমহাদেশে পীর-ফকির- দরবেশ শ্রেণীর যে মানুষরা ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন তাঁরা তলোয়ারের ব্যবহার করেননি, ব্যবহার করেছেন ভক্তিবাদ আর তাই ধর্মান্তরিত না হয়েও তাঁদের ভক্ত
হয়েছেন বহু ভিন্ন ধর্মের মানুষ ।

ভারতের আজমীর শরীফে হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতির মাজারে আমি নিজেই দেখেছি, হিন্দু , শিখ এবং অন্যান্য ধর্মের মানুষকে সমবেত হতে।

ইসলামের এই অসাম্প্রদায়িক দিকগুলো আরবের কথিত বিশুদ্ধবাদীদের প্রভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে আর তাই দেখা যাচ্ছে ধর্মের ধ্বজা তুলে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভেতরে সাম্প্রদায়িক উপাদানগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে।

তারুণ্যের আরেকটি অংশ আসছে কওমি মাদ্রাসা থেকে ।

সেখানে যান্ত্রিকভাবে ফর্মূলা আকারে ধর্ম শিক্ষা দেয়া হচ্ছে ।

অনুসঙ্গের বাইরে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ভাবে যে সব ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে তাতে তরুণ মনে কট্টর মোল্লাতন্ত্রই স্থান পাচ্ছে কিন্তু দেশ প্রেম নয় ।

সে জন্যই আমরা কিছুদিন আগে লক্ষ্য করেছিলাম একটি মাদ্রাসা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনের প্রয়াস পেয়েছিল যদিও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।

কিন্তু সেটাই ছিল এক ধরণের অশনী সংকেত ।

মাদ্রাসার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে বিদ্যালয় বা শিক্ষাকেন্দ্র।

সত্য বটে যে এখানে ধর্মীয় শিক্ষার উপর জোর দেয়া হয় তারপরও অন্যান্য বিদ্যালয়ের মতো মাদ্রাসায়ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং সেই সময়ে ধর্মের যে অপব্যবহার করা হয়েছিল সেই বিষয়ে তাদের পাঠদানের প্রয়োজন আছে ।

এই ইতিহাসবোধ থেকে বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা এমন এক গন্ডিবদ্ধ বিশ্বে বসবাস করবে যেখানে তাদের নিজেদের দেশকে তারা নিজেরাই খুঁজে পাবে না , বুঝবে না আমাদের মধ্যে একাত্তরের চেতনা কারণ এরই মধ্যে মানুষকে মাপার মাপকাঠিটা তারা বদলে ফেলেছে হয়ত ।

মগজ ধোলাইয়ে বিষয়টা এত বেশি কার্যকর করে ফেলবে যে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একেবারে প্রান্তিক হয়ে পড়বে।

মাদ্রাসার এই সব ছাত্রছাত্রী ডিজিটাল জ্ঞানেও এতটা পিছিয়ে থাকছে যে গুগল করেও বাংলাদেশের ইতিহাস জানার কোন আগ্রহ হয়ত ওদের মধ্য থাকবে না।

সেই আশংকা আমাকে বার বার পীড়িত করে।

আমি না হয় একাত্তরেই থাকবো কিন্তু আমাদের সন্তানরা ।

একাত্তর তারা দেখেনি কিন্তু এটুকু কি তারা বুঝবে না যে একাত্তরের বিজয় না এলে তাদের বাবা-মা এবং অতএব তারাও পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে থাকতো ।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর ও বাণী মুছে যেতো , নজরুল থেকে যেতেন কেবল খন্ডিত সত্বা হয়ে , রক্তাক্ত এক অর্ধ-পুরুষ হয়ে।

আমি তাই একাত্তরেই থাকি ।

বছরের হিসেবে পিছাই বটে , চেতনায় এগোই অনেকটা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here