আজকের সাপ্তাহিক বাঙালীতে প্রকাশিত আমার লেখা # পাঠকদের পড়ার সুবিধার্থে লেখাটির পান্ডুলিপি পোস্ট করছি # সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে # আনিস আহমেদ ফেসবুকে লিখেছেন

0
89

আজকের সাপ্তাহিক বাঙালীতে প্রকাশিত আমার লেখা । পাঠকদের পড়া সুবিধার্থে লেখাটির পান্ডুলিপি এখানে পোস্ট করছি।

সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে।।।।

আনিস আহমেদ।।।।

এ কোন আগুন এখন ছড়িয়ে যাচ্ছে সব খানে ? যে সুরের আগুন ছড়িয়ে দেবার এক অসাধারণ প্রত্যয় আমরা শুনেছিলাম রবীন্দ্রাথের গানে, সে আগুন থেকে এখন আমরা যেন ভিন্ন পথে হাঁটছি।

এখন ছড়িয়ে যাচ্ছে অসুরের আগুন সবখানে, নৃশংসতার দংশনে তৈরি হচ্ছে নতুন তত্ব, যেন লেখা হচ্ছে নতুন কোন অভিসন্দর্ভ।

খবরের কাগজ খুললেই সেই অসুরের আগুন ছড়িয়ে যাবার সংবাদ শুনি সর্বত্রই ।

এই যে প্রায় সপ্তাখানেক আগে, মানসিক ভাবে অসুস্থ্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুল করিমকে তাঁর বিষণ্ণতাবোধ থেকে মুক্ত করানোর চেষ্টায় একটি মানসিক হাসপাতালে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে এ কোন আগুন ছড়িয়ে ফেলার নির্মম কাহিনী !

অভিযোগ হচ্ছে তাঁর উপর নির্যাতন চালিয়েছে হাসপাতালের অন্যতম অধিকর্তা এবং একাধিক অধীনস্থ কর্মচারি। তাকে পিটিয়ে, শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে, তাদের কথায় ট্রিটমেন্ট করা হচ্ছিল।

অভিযোগের সত্যাসত্য আদালতে যাচাই করা হবে, সে নিয়ে আমার বলার কিছু নেই তবে এই পুলিশ কর্মকর্তা,যিনি শারিরীক ভাবে সুস্থ্য হয়ে প্রবেশ করেছিলেন তিনি যে প্রায় লাশ হয়ে বেরিয়ে এলেন, সেটাই কষ্ট-কথা। সেটাই সুরের বেশে অসুরের কাহিনী ।

এ রকম ঘটনা আমরা প্রায়শই শুনি । চোর কিংবা ছেলে-ধরা মনে করে পিটিয়ে হত্যা করা এগুলো যে ডালভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে ভেবে এ সব ঘটনা আমাদের মনে আজকাল আর রেখাপাত করে না।

রেখাপাত করে না আমাদের মনে এ ও যখন সামাজিক মাধ্যমে কারো লেখা কিংবা কোন মন্তব্য দেখে আমাদের ভেতরকার পশুটা আপনা থেকে জেগে ওঠে এবং সামাজিক মাধ্যম আমাদের এতটাই অসামাজিক করে তোলে যে কথিত আবেগে আত্মহারা হয়ে আমরা মন্তব্যকারিকে হত্যা করি।

আর মন্তব্যকারি যদি ভিন ধর্মের অনুসারী হন তা হ’লে গোটা সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়ি আমরা নিমেষেই পুড়িয়ে দিচ্ছি এবং “জাহান্নামের আগুনে বসে হাসি পুষ্পের হাসি”।

বলাই বাহুল্য এই পুষ্প দর্শনেরই কেবল, এর পেছনে রয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক এক কন্টকিত নির্মম সত্য। সম্প্রতি ফ্রান্সে ইসলামের নবী হজরত মোহাম্মদ (সা) ‘এর ব্যঙ্গ চিত্র ক্লাসে প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সে, বেলজিয়ামে এবং অতি সম্প্রতি সৌদি আরবে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তার তূলনায় বাংলাদেশে কিংবা অন্যান্য দেশে প্রতিক্রিয়া হয়েছে হয়ত সামান্য কিন্তু এতে আরও একবার বিদ্বেষের আগুন ছড়িয়ে ছিল আমাদের সেই দেশে যার প্রতিষ্ঠা এবং পথচলা অস্ম্প্রদায়িকতার পথ ধরে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে কোন ধর্মের প্রবর্তক, নবী-রসুল, সাধু -সন্ন্যসীকে বাক-স্বাধীতার নামে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ বা কটাক্ষ করা অত্যন্ত নিন্দনীয় । বাক স্বাধীনতার মধ্যে যে শালীনতার বিষয়টি থাকা উচিত্ সে কথাটা যেন মাঝে মাঝে অনেকেই ভুলে যান।

ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব যে রাজনৈতিক কোন ব্যক্তি নন, সেখানে যে গভীর এক রকমের আবেগ সক্রিয় থাকে সে কথা বোঝার মতো জ্ঞান নিশ্চয়ই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ই্ম্যানুয়েল ম্যাক্রঁর ছিল কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অজুহাত দেখিয়ে ব্যঙ্গ চিত্র প্রদর্শনকে যৌক্তিকতা প্রদান ছিল নিন্দনীয় বিষয় ।

তিনি কি ভুলে গিয়েছিলেন যে ধর্মীয় বিষয়ে যুক্তি নয় ভক্তিটাই বড় কথা। আর সেই ভক্তির জায়গায় আঘাত লাগলে মানুষ নিঃসন্দেহেই ক্ষুব্ধ হয় ।

ক্ষোভ এবং সহিংসতার মধ্যে পার্থক্যটা যে খুব সুক্ষ তা কিন্তু নয় । ক্ষুব্ধ মানুষ যখন সহিংস হয়ে ওঠে তখন তার মনুষত্ব লোপ পায় । তার ক্ষোভ এবং কষ্ট বিলুপ্ত হয় এবং সে তখন দানবের রূপ গ্রহণ করে যা ইসলামতো বটেই সকল ধর্মেই পরিহার যোগ্য। তাই যখন শুনি জেদ্দায় খ্রীষ্টানদের কবরস্থানে লোক হত্যার কথা, ফ্রান্সের রাস্তায় মানুষ মারার খবর এমনকী শত সহস্র মাইল দূরে বাংলাদেশে যখন দেখি হিন্দুদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে উল্লসিত হবার ছবি , তখনতো দেখতে পাই যে আগুন সবখানে ছড়িয়ে যায় সে কোন ভালোবাসার আগুন নয় “হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বির” চালচিত্র সেটি । এই সব লোক কী ভুলে যায় মহনবীর সহনশীলতার অজস্র কাহিনী, ভুলে যায় কি তারা বহুল পঠিত সেই ঘটনার কথা যেখানে যে বুড়ি তাঁকে আঘাত করার জন্য পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো প্রতিদিন, তাকে একদিন না পেয়ে যখন তিনি জানতে পারেন সে অসুস্থ
তখন তার বাড়িতে গিয়ে তার সেবা শুশ্রষা করেন!

এমন যে প্রতিপক্ষ ছিল তাঁর, তাকেও তিনি তাঁর মানবিক অনুভূতি দিয়ে দেখেছেন। তাঁর বিদায় হজের বাণীতে তিনি স্পষ্টতই বলেছিলেন সকল মানুষ সমান, আরব কিংবা অনারব সকলেই, সাদা কিংবা কালো সকলেই। সে সব কথা অগ্রাহ্য করে চলে এখনকার উগ্রবাদীরা ।

তারা বোঝেই না যে মানুষ এখন জিহাদ কিংবা ক্রুসেড অথবা মহাভারতের যুদ্ধের যুগে নেই । এখন ধর্ম প্রচারের যে ব্যাপক স্বাধীনতা রয়েছে সেখানে ধর্ম-যুদ্ধের কোন স্থান নেই কিন্তু সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদীরা প্রত্যহই সুযোগমত হত্যাযজ্ঞ চালায় ।

লক্ষ্য করার বিষয় যে পাকিস্তানে কিংবা আফগানিস্তানে জুমার নামাজের সময়ে মসজিদে নিরীহ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এই উগ্রবাদীরাই হত্যা করেছে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এই ব্যাধি থেকে কবে মুক্ত হবে বিশ্বসমাজ , মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতেই কি জিম্মি থাকবে মনুষত্ব সেটাই ভাববার বিষয়।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার বিপরীত মেরু থেকে। অস্বীকৃত হয়েছিল ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যকার অসম সমীকরণ, পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রিক বাস্তবতাকে ধর্মের ধোঁয়াশায় সব সময়ে মিলিয়ে রাখার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বাঙালি সংগ্রাম করেছে। বাঙালি ও মুসলমানের মধ্যে একসময়ে যে একটা কৃত্রিম বিভেদ রেখা টেনেছিলেন সে কালের হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই সেই বিভাজনের পরিসমাপ্তি ঘটলো বাংলাদেশ সৃষ্টির পর। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে পরবর্তী পর্যায়ে , মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্বাজাত্যবোধের সঙ্গে যথেষ্ট আপোষ করেছে বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারই রাজনৈতিক কারণেই। অনাবশ্যক মাদ্রাসা শিক্ষার যে বিস্তার ঘটেছে বাংলাদেশে তাতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে এতটাই যে সেখানে বাঙালির সংস্কৃতি বিলুপ্ত অনেকখানিই ।

সম্প্রতি কুমিল্লার মুরাদনগরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের সুরে ইসলামি গান গাওয়া এবং সেটাকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে চালু করার যে একটি অসাধু প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছিল, তাতে অশনীসংকেত পেয়েছি আমরা সকলেই ।

সৌভাগ্যবশত সেই আগুন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার আগেই মাদ্রাসাটিকে সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। তবে এখনই সময় এসেছে সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধিকে দমন করার, অন্য দেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজের দেশের নিরপরাধ জনগোষ্ঠির ক্ষতি সাধন বন্ধ করার এবং সামাজিক মাধ্যমে কে কি লিখেছে সেটাকে মূলধন করে সমাজকে সহিংস এবং অসহিষ্ণু করা থেকে বিরত থাকার।

আমরা অসুরের আগুন নয়,সুরের আগুন সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার পক্ষে যাতে থাকবে সমন্বয় ও সম্মিলনের বার্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here